ওয়েস্টমিনিস্টার বিদ্রোহের ব্যবচ্ছেদ-ডেড লাইন ১১ই মে
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
এল.এল.বি (অনার্স), এল.এল.এম,পিজিডিপ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবী
ব্রিটেনের রাজনীতিতে প্রবাদ আছে, “ক্ষমতাই সব নয়, ক্ষমতার স্থায়িত্বই আসল “।ব্রিটিশ রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত ৭ মে’র স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির নজিরবিহীন বিপর্যয় কেবল একটি দলীয় পরাজয় নয়, বরং এটি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের নেতৃত্বের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। হর্নসি অ্যান্ড ফ্রিয়ার্ন বারনেট আসনের এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্টের সাম্প্রতিক আল্টিমেটাম এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহের ডাক এখন ওয়েস্টমিনিস্টারের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
১.পরিসংখ্যানের বয়ানে বিপর্যয়: কেন এই বিদ্রোহ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আবেগ নয়, পরিসংখ্যানই শেষ কথা বলে। এবারের নির্বাচনের উপাত্তগুলো স্টারমারের জন্য রীতিমতো আতঙ্কজনক।
আসন হারানো:লেবার পার্টি সারা দেশে প্রায় ১,১০০-এর বেশি কাউন্সিলর এবং ২৮টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
রিফর্ম ইউকে-র উত্থান: নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে প্রায় ১,২৫৭টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা সরাসরি লেবারদের শক্ত ঘাঁটিতে ধ্বস নামিয়েছে।
লন্ডনের পতন: দক্ষিণ লন্ডনের সাউথওয়ার্কের মতো ‘নিরাপদ’ এলাকায় গ্রীন পার্টির কাছে হার এবং রচডেল ও কামব্রিজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো প্রমাণ করে যে, ঐতিহ্যবাহী লেবার ভোটাররা এখন বিকল্প খুঁজছে।
ক্যাথরিন ওয়েস্টের মতে, এটি কেবল পরাজয় নয়, এটি একটি ‘ইলেক্টোরাল ইমারজেন্সি’ বা নির্বাচনী জরুরি অবস্থা।
২. ‘স্টকিং হর্স’ কৌশল ও সোমবারের ডেডলাইন-
বিবিসি-র ‘লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে ক্যাথরিন ওয়েস্টের সাক্ষাৎকারটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং মন্ত্রিসভার (ক্যাবিনেট) শক্তিশালী সদস্যদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “মন্ত্রিসভার উচিত নিজেদের একটি কক্ষে আটকে রাখা এবং এমন একজনকে বেছে নেওয়া যিনি আমাদের নেতৃত্ব দিতে পারেন।
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আগামী ১১ই মে রোজ সোমবার প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত ‘রিলঞ্চ স্পিচ’ বা নীতি-নির্ধারণী ভাষণটি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি সেখানে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন না দেখেন, তবে তিনি ৮১ জন এমপির (মোট এমপির ২০%) স্বাক্ষর সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করবেন, যা আনুষ্ঠানিকভাবে লিডারশিপ চ্যালেঞ্জ শুরু করার জন্য যথেষ্ট।
৩. ছায়া নেতৃত্বের লড়াই: স্ট্রিটিং বনাম রেনার-
বিশ্লেষক হিসেবে আমি লক্ষ্য করছি যে, বিদ্রোহীরা কেবল স্টারমারকে সরাতেই আগ্রহী নয়, তারা একটি টেকসই বিকল্প চায়। বর্তমানে তার তিনটি ধারা স্পষ্ট:
সংস্কারপন্থী: যারা ওয়েস স্ট্রিটিং (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) বা অ্যাঞ্জেলা রেনার (উপ-প্রধানমন্ত্রী কে নেতৃত্বে দেখতে চান।
বার্নহ্যাম ফ্যাক্টর: ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে লর্ড সভার মাধ্যমে বা উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্বে আনার একটি জোরালো দাবি উঠেছে।
বামপন্থী অসন্তোষ:জশ সাইমন্স এবং আনা ডিক্সনের মতো এমপিরা মনে করেন স্টারমার দেশের মানুষের সাথে ‘ডিসকানেক্টেড’ হয়ে পড়েছেন। এমনকি ‘ইউনাইট’ ইউনিয়নের নেত্রী শ্যারন গ্রাহাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, স্টারমার আর পরবর্তী নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেবেন না।
৪. ক্যাবিনেটের অবস্থান ও রাজনৈতিক ঝুঁকি: সরকারের পক্ষে ক্যাবিনেট অফিস মন্ত্রী নিক থমাস-সাইমন্ডস এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন বারবার ‘অস্থিরতা’ এড়ানোর কথা বলছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, এই মুহূর্তে নেতৃত্ব বদল মানে রিফর্ম ইউকে-র জন্য মাঠ আরও সহজ করে দেওয়া। কিন্তু বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখলে, দল যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন ক্যাবিনেটের সংহতি খুব দ্রুত ভেঙে যেতে পারে।
৫. প্রধানমন্ত্রীর জন্য শেষ সুযোগ: আগামীকাল সোমবারের ভাষণটি স্যার কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক জীবনের ‘মেক অর ব্রেক’ মুহূর্ত। যদি তিনি কেবল ‘রিফ্রেস’ বা ‘রিসেট’-এর গালভরা বুলি আওড়ান, তবে ক্যাথরিন ওয়েস্টের হাতে থাকা ওই ১০ জন এমপির সংখ্যা দ্রুত ৮১-তে পৌঁছাতে সময় লাগবে না।
একজন বিশ্লেষক ও আইনজীবী হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ এবং খোদ লেবার এমপিরা এখন আর শুধু ডাউনিং স্ট্রিটের ভাষণ শুনতে চান না, তাঁরা দেখতে চান দৃশ্যমান পরিবর্তন। স্যার স্টারমার যদি তা দিতে ব্যর্থ হন, তবে সোমবারই হতে পারে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান শুরুর প্রথম দিন।



