ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সিলেটের শিল্পকারখানা
গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীতে ঢুকতেই বোঝা গেল, কারখানাগুলোর ব্যস্ততার মধ্যেও কোথাও যেন ছন্দপতন। কোনো কারখানায় মেশিন চলছে, আবার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ সব শব্দ থেমে যাচ্ছে। কয়েক মিনিট নীরব থাকার পর কোথাও জেনারেটরের শব্দ শুরু হচ্ছে। কিন্তু তাতেও আগের গতি ফিরছে না।
কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের ব্যস্ততা আছে, মেশিনও আছে, কাঁচামালও আছে। নেই শুধু নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ।
গত পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলছে সিলেটের গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীর প্রায় ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, প্রতিদিন সাত থেকে আটবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। শুধু বিদ্যুৎ চলে যাওয়াই নয়, সরবরাহ থাকলেও ভোল্টেজের ওঠানামা নতুন বিপদ তৈরি করছে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি পুড়ে যাচ্ছে মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
কারখানাগুলোতে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা উৎপাদন চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এখন কার্যকরভাবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি মেশিন চালানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। অর্থাৎ কারখানা চালু থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ পড়ে থাকছে অব্যবহৃত।
গোটাটিকর শিল্পনগরীর একটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েকটি মেশিন বন্ধ। শ্রমিকরা অপেক্ষা করছেন বিদ্যুৎ আসার। কোথাও আবার জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু জেনারেটরের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সব মেশিন একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্ষতি এক জায়গায় থেমে থাকে না। মেশিন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদন পিছিয়ে যায়, সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ভোল্টেজ ওঠানামা করলে মেশিনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে অতিরিক্ত মেরামত ব্যয় যোগ হয়।
তামাম পিভিসি ইন্ডাস্ট্রির প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোকাদ্দেস হোসেন বলেন, ‘ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের যে হারে ক্ষতি হচ্ছে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই আনুপাতিক হারে ক্ষতি হচ্ছে। তাই শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
শুধু বিদ্যুৎ না থাকার সময়টুকুই উদ্যোক্তাদের ভাবাচ্ছে না। ভোল্টেজের ওঠানামাকেও তারা বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। কারণ, বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর মেশিন চালু করলেও হঠাৎ ভোল্টেজ কমে বা বেড়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেশিন মেরামত করতে হচ্ছে, আবার কোথাও নতুন যন্ত্রাংশ কিনতে হচ্ছে।
বিসিক শিল্প মালিক সমিতি সিলেটের সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী বলেন, ‘ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে বারবার ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এতে একদিকে ঠিকমতো মেশিন চালানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে মেশিন বিকল হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে মেশিন বিকল হওয়ায় বেশ ক্ষতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে আরও ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।’
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু কারখানার মেশিনে আটকে নেই। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও কমছে। অথচ ব্যাংকঋণের কিস্তি, শ্রমিকদের বেতন, সরকারি কর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচসহ অন্যান্য ব্যয় আগের মতোই রয়েছে। ফলে আয় কমলেও খরচ কমছে না।
জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছেন অনেক উদ্যোক্তা। কিন্তু এতে আবার বাড়ছে ডিজেলসহ জ্বালানি ব্যয়। তাছাড়া সব ধরনের ভারী মেশিন জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো সম্ভব নয়। ফলে জেনারেটর থাকলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছে বিসিক শিল্প মালিক সমিতি। শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগর ও আশপাশের শহরাঞ্চলে পিডিবির আওতায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। আর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় চাহিদা প্রায় ৩০৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে সিলেটে ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। আর সেই ঘাটতির চাপ গিয়ে পড়ছে বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পকারখানাতেও।
সিলেট পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয় জাতীয় ইস্যু।’ তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগের তুলনায় এখন অনেকটা উন্নতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কিন্তু গোটাটিকর শিল্পনগরীর উদ্যোক্তাদের কাছে উন্নতির সেই হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারখানার মেশিন কতক্ষণ চলছে, কতটুকু উৎপাদন হচ্ছে আর মাস শেষে কতটা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কারখানার মেশিন থেমে গেলে শুধু একটি উৎপাদন লাইনই থামে না। থেমে যায় শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, আটকে যায় অর্ডার, বাড়ে জ্বালানি খরচ। আর ভোল্টেজের ধাক্কায় নষ্ট হওয়া মেশিন যোগ করে দেয় নতুন খরচ।
শিল্পনগরীর উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়, কারখানায় মেশিন চালানোর মতো নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ।




