জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই: হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের দিন-তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির।
শনিবার দুপুরে সিলেট নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে শুক্রবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠান কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে বসেন প্রতিমন্ত্রী। পরে মতবিনিময়কালে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্পৃক্ততা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়গুলোও এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি কার্যকর সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের প্রত্যাশার বিষয়গুলো ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছেন।’
ভারতে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে দুই দফা সাক্ষাতের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের দিন-তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কোনো সম্ভাবনা নেই।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বার্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে নানা মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে হাজার সমস্যা থাকলেও আলোচনার পথ বন্ধ নেই। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কই থাকা উচিত।’
ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা
রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও একটি কার্যকর কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠছে।
তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। ওয়াশিংটন, বেইজিং, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় ও কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ রাখার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়, পুনর্বিন্যাস ও কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে হবে।
‘সাইকোপ্যাথিক দুর্নীতি’ হয়েছে জ্বালানি খাতে
দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কীভাবে একটি সাইকোপ্যাথিক দুর্নীতি করা যায়, এনার্জি সেক্টর দেখলে বোঝা যাবে।’
তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা
নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রসঙ্গে মক্কা চুক্তির প্রসঙ্গও তোলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
‘অনেক দেশই এখন একাধিক নিরাপত্তা জোটে থাকছে। জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে যেখানে যাওয়া দরকার, সেখানে যাওয়া হবে’ বলেন তিনি।
বোয়িং কেনায় চাপ নেই
বিমান কেনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কিনতে বাংলাদেশকে কেউ চাপ দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘বোয়িং কিনতে হবে, এটা কেউ চাপিয়ে দিচ্ছে না। চাহিদা আছে বলেই আমেরিকা থেকে বোয়িং কেনা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও কেনা হবে।’
মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানি
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি সিন্ডিকেটের কারণে সেখানে শ্রমশক্তি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। বর্তমান সরকার সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ধাপে ধাপে মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানি করা হবে বলেও জানান তিনি।
কলকাতায় বাংলাদেশিরা হোটেলে থাকার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আনলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব করার পরিকল্পনা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল কেন্দ্র বা আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর মতে, দেশের পরিবহন ও বিমান যোগাযোগব্যবস্থা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত। ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
ভুটান, বাহরাইন ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অভিন্ন স্বার্থে আঞ্চলিক দেশগুলো যাতে সমন্বিত অবস্থান নিতে পারে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করে হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ কারণে শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষতার স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
মতবিনিময় সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী এবং সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ চৌধুরীসহ ইমজার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



