রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার: বাবা-মায়ের মরদেহ দেখে মর্গে কান্নায় ভেঙে পড়লেন দুই মেয়ে
সিলেট নগরের রায়নগরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের মরদেহ দেখতে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেছেন তাঁদের দুই মেয়ে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটে পৌঁছেই তাঁরা ছুটে যান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। সেখানে বাবা-মায়ের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে দুই মেয়ে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁরা সরাসরি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে যান। সেখানে বাবা-মায়ের মরদেহ দেখে তাঁরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। স্বজনদেরও এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তানই প্রবাসে থাকেন। তাঁদের দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। ছেলে আরিফ ইফতেখার শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার নয়াসড়ক এলাকার হযরত মানিক পীর (রহ.) মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের দাফন হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, একই ঘটনায় নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বুধবার সকালে রায়নগরের মিতালী এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা (১৮)-এর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ছিলেন। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাও ছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে নিজ বাসাতেই থাকতেন তিনি।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে বাবুল মিয়াকে (৪০) আটক করে পুলিশ। তিনি নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বেলা ৩টার দিকে তাঁকে আটক করা হয়।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন। পরে একটি কক্ষে তাঁদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন।
তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে পুলিশের দাবি। পরে স্ত্রীর চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও আক্রমণ করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল বাসার বারান্দা দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যান। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলের কাছের একটি ঝোপ থেকে দ্বিতীয় দফায় ছুরিটি উদ্ধার করা হয়।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। আটক বাবুলকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দের বাধ্যবাধকতার কারণে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. মাঈনুল জাকির জানান, নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার শুক্রবার দেশে ফেরার পর পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হবে।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ এবং এতে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করা হচ্ছে।



