সিলেটের ‘গলার কাঁটা’ হাইটেক পার্ক
কোম্পানীগঞ্জের বর্ণি গ্রামের শেষ মাথায় পৌঁছালে হঠাৎই চোখে পড়ে বিশাল এক ফটক। ফটকের ওপারে চওড়া সড়ক, আধুনিক নকশার ভবন, সারি সারি লাইটপোস্ট। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, ভেতরে হয়তো চলছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত কোনো প্রযুক্তি নগরীর কর্মযজ্ঞ। কিন্তু কয়েক কদম এগোলেই সেই ধারণা ভেঙে যায়। কোথাও মানুষের ভিড় নেই, নেই সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের ব্যস্ততা, নেই নতুন কোনো স্টার্টআপের কোলাহল। বাতাসে শুধু আগাছার দোলা, খালি ভবনের নীরবতা আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির দীর্ঘশ্বাস।একসময় বলা হয়েছিল, এখান থেকেই বদলে যাবে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের অর্থনীতি। তৈরি হবে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। গড়ে উঠবে পাঁচতারকা হোটেল, আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিং সেন্টারসহ প্রায় ৪০টি সেবা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। এখানকার প্রযুক্তিপণ্য সহজেই পৌঁছে যাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের বাজারে।
কিন্তু প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেট হাই-টেক পার্কের সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি স্থগিত বা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০১৬ সালের ৮ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৩৬ কোটি টাকা। পরে ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৭২ একর জমির ওপর পার্কটি নির্মাণ করা হয়।
২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম শুরু হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি স্থগিত বা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেট সফরে এসে প্রকল্পটি পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীও পার্কটি চালুর পক্ষে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য আধুনিক অবকাঠামো, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ডেটা সেন্টার, গবেষণাগার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ নানা সুবিধা গড়ে তোলার কথা ছিল। একই সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছিল।কিন্তু বাস্তবে অবকাঠামোর বড় অংশ নির্মিত হলেও সেই ভবনগুলো এখনো পুরোপুরি প্রাণ পায়নি।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নয়টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৩ দশমিক ৮ একর জমি এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ৯ হাজার ১০ বর্গফুট স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এত প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ নেওয়ার পরও কার্যক্রম চালাচ্ছে হাতে গোনা একটি প্রতিষ্ঠান, র্যাংগস ইলেকট্রনিকস। সেটিও পূর্ণ সক্ষমতায় নয়।
র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হাই-টেক কর্তৃপক্ষ আমাদের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সুবিধার কথা বলেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনটির কোনোটিই ধারাবাহিকভাবে পাচ্ছি না। পরিবেশ পুরোপুরি প্রস্তুত হলে আমরা বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছি।”
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অবকাঠামোগত কাজের বড় অংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম শুরু এবং কিছু নীতিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় পার্কটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। এটি সচল করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
সিলেট হাই-টেক পার্কের সহকারী পরিচালক এস এম আল মামুন জানান, প্রকল্পটি সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি কাজ করছে। নির্বাচনের পর প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি পুনর্বিন্যাসের বিষয়ও পর্যালোচনায় রয়েছে।
এই পার্ককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিলেন সিলেটের তরুণরা। অনেকেই ভেবেছিলেন, চাকরির জন্য আর ঢাকামুখী হতে হবে না। নিজেদের শহরেই তৈরি হবে প্রযুক্তি শিল্পের নতুন কেন্দ্র। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও সেই স্বপ্ন বাস্তব না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরহাদ রাব্বি বলেন, ‘একটি হাই-টেক পার্ক সফল করতে শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হয় না। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা। এসবের ঘাটতি থাকলে অবকাঠামো অব্যবহৃতই থেকে যায়।’
তার মতে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ফাঁক কমানো না গেলে এ ধরনের বড় প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদের ভাষায়, ‘বর্তমানে এটি ভুতুড়ে ঘরে পরিণত হয়েছে। এটা এখন অনেকটা গলার কাঁটা। না পারছি গিলতে, না পারছি উগরাতে।’
তার মতে, প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা গেলে শুধু সিলেট নয়, পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সিলেট হাই-টেক পার্কের কংক্রিটের দেয়ালগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে। খালি সড়কগুলোও অপেক্ষা করছে মানুষের পদচারণার জন্য। প্রশ্ন হলো, এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?
একসময় যে প্রকল্পকে বলা হয়েছিল উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিপ্লবের সূচনা, সেটি কি আবার নতুন জীবন পাবে, নাকি কোটি কোটি টাকার এই অবকাঠামো ধীরে ধীরে পরিণত হবে আরেকটি পরিত্যক্ত উন্নয়ন প্রকল্পে?
উত্তরটি এখনো সময়ের কাছেই ঋণ হয়ে রয়ে গেছে।




