মাগুরছড়ার গ্যাসকূপ বিস্ফোরণ: আজ সেই ভয়াল ১৪ই জুন, ২৯ বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়ার সেই ভয়াল রাত আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে গ্যাস অনুসন্ধান কূপে বিস্ফোরণের পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুনের বিশাল শিখা আকাশ ছুঁয়ে ওঠে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন মানুষ।
ঘটনার প্রায় ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিস্ফোরণের ক্ষত এখনো বহন করছে মাগুরছড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল অব বাংলাদেশ লিমিটেডের কাছ থেকে আজও কোনো কার্যকর ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়নি।
তৎকালীন সরকার ১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর গ্যাস ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করে। এর অংশ হিসেবে কমলগঞ্জের মাগুরছড়ায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতায় খননের পরিকল্পনা থাকলেও মাত্র ৮৪০ মিটার গভীরতায় পৌঁছানোর পরই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, চা-বাগান ও বিস্তীর্ণ এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, গ্যাস পাইপলাইন, সড়ক ও রেলপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। পরিবেশবিদদের মতে, ওই ঘটনায় বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। অসংখ্য গাছপালা পুড়ে যায়, প্রাণ হারায় বহু বন্যপ্রাণী ও পাখি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের পর কয়েকশ ফুট উঁচু আগুনের শিখা দূর-দূরান্ত থেকেও দেখা যাচ্ছিল। টানা প্রায় ১৫ দিন আগুন জ্বলতে থাকে। পরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু হয়। পুরো কূপটি সিল করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগে ছয় মাসেরও বেশি।
তেল-গ্যাস খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই দুর্ঘটনায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়েছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকার সমান। পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণও ছিল অপরিমেয়।
১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলেও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি থেকে যায় অনিষ্পন্ন। এর আগেই ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে অক্সিডেন্টাল কার্যক্রম গুটিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এ কারণে প্রতি বছর ১৪ জুন মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি দিবস পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। মানববন্ধন, স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছেন।
মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির এক বাসিন্দা বলেন, “বন, পাহাড় আর পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো আমরা টের পাই। এত বছর পরও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি ঝুলে আছে, এটা আমাদের জন্য হতাশার।”
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, মাগুরছড়া শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম বড় উদাহরণ। তাদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।



