সিলেটের উন্নয়নে পর্যটন-যোগাযোগ খাতে বরাদ্দের সুষ্ঠু বণ্টন চান ব্যবসায়ীরা
দেশের অন্যতম পর্যটন নির্ভর অঞ্চল সিলেটের উন্নয়নে পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান খাতে বড় ধরনের প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ীদের। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানালেও এসব খাতে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প, চা খাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানের প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যায়নি। তাদের দাবি, সিলেটের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু বণ্টন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সিলেটের যোগাযোগ খাত উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ, যা আমদানি-রপ্তানি ও কার্গো পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। পাশাপাশি দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিলেটের রেল যোগাযোগেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ, এক্সপ্রেসওয়ে সম্প্রসারণ এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিলেটের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। নৌপথ ও বন্দর উন্নয়নও এ অঞ্চলের বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, সৃজনশীল অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেবল বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, বরাদ্দকৃত অর্থের অর্ধেকও যদি যথাযথভাবে ব্যয় করা যায়, তাহলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
একই সঙ্গে চা শিল্পের সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে ভারতীয় চা প্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। এছাড়া ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জটিল কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা, চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তাহীনতাকে ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
তাদের মতে, পর্যটনের আধুনিকায়ন, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সিলেট দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে সে জন্য বাজেট ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, বর্তমান বাজেট আশাবাদী হলেও পুরোপুরি বাস্তবমুখী হয়ে উঠতে পারেনি।
তার ভাষ্য, ‘বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র তিন মাস। ফলে এখনই একটি পরিপক্ব বাজেট প্রত্যাশা করা কঠিন। সরকারের পরিকল্পনার সুফল পেতে আরও কিছু সময় লাগবে।’
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আইন ও নিয়ম মেনে চলতে বেশি আগ্রহী হয়, যা দেশের জন্য সুখবর। তবে পর্যটন খাতে বরাদ্দকৃত ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।’
ফালাহ উদ্দিন বলেন, ‘সিলেটের মতো পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলের উন্নয়নেই আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ভঙ্গুর অর্থনীতির এই সময়ে ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে কেবল শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথের উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অনিয়ম রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।’
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ বলেন, ‘বড় শিল্পকারখানা না থাকায় পর্যটনই সিলেটের প্রধান শিল্প। তাই এ খাতের উন্নয়নে আরও বড় বরাদ্দ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বরাদ্দ কম হলেও তা দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কঠোর তদারকি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।’
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। পাশাপাশি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ বিমান ভাড়া প্রবাসীদের দেশে আসা ও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।’
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন, ‘প্রতিবছর পর্যটন খাতে কিছু বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। পর্যটননির্ভর অর্থনীতির অঞ্চল হিসেবে সিলেটের জন্য আরও বড় পরিসরের বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।’



