বর্ষার শুরুতেই পানি বাড়ার শঙ্কা, নজরে সিলেট-সুনামগঞ্জ
বর্ষার শুরুতেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আবারও নদ-নদীর পানি বাড়ার আভাস মিলেছে। আগামী এক সপ্তাহে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাবে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার ঝুঁকি নেই। কোথাও কোথাও পানি উঠলেও বৃষ্টিপাত কমে এলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ সাত দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ২১ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের পাশাপাশি ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট অঞ্চলের অধিকাংশ নদীই ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সীমান্তের ওপারে ভারী বৃষ্টিপাত হলে তার প্রভাব দ্রুত সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা ও অন্যান্য নদীতে পড়তে শুরু করে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত বাড়লে সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি বা বড় ধরনের বন্যার কোনো আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা এবং হাওরাঞ্চলের কিছু অংশে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একই সময়ে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, কংস, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানিও বেড়েছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এসব নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার হাওরসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে সতর্কতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উজানে অতিবৃষ্টি হলে দ্রুত নেমে আসা ঢলে নিচু জমি ও গ্রামীণ সড়ক সাময়িকভাবে তলিয়ে যেতে পারে।
তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বোরো ধান ঘরে তোলার কাজ শেষ হওয়ায় কৃষিখাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগর ও এর আশপাশের এলাকায় মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকায় বৃষ্টিবহুল আবহাওয়া বিরাজ করছে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়েছে। আগামী কয়েক দিন সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসেও একই চিত্র উঠে এসেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও হতে পারে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বড় বন্যা না হলেও আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও স্বল্পমেয়াদি প্লাবন এখন বর্ষা মৌসুমের নিয়মিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে নদীতীরবর্তী ও হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বশেষ আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিস্থিতি এখনই উদ্বেগজনক নয়। তবে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান এলাকার আবহাওয়ার ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে। কারণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানিপ্রবাহের বড় অংশই নির্ভর করে সীমান্তের ওপারের বৃষ্টিপাতের ওপর। ভারী বর্ষণ হলে স্থানীয়ভাবে পানি বৃদ্ধির পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।



