লাউয়াছড়ায় গাছ পাচারের অভিযোগ, বন বিভাগের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
লাউয়াছড়ার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে ঢাকা পাহাড়ি বন, পাখির ডাক আর জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ আবাসস্থল। কিন্তু সম্প্রতি উদ্যানের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র। ঘন জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে যেন কথা বলছে সারি সারি কাটা গাছের গোড়া। প্রধান ফটক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি গাছ কেটে নেওয়ার চিহ্ন মিলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করছে। যদিও বন বিভাগ এমন অভিযোগ অস্বীকার করে নিয়মিত নজরদারির দাবি করেছে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মূল্যবান গাছ কাটার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে উদ্যানের বিভিন্ন অংশ থেকে সেগুন, আগর, আকাশমণি, চামলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে পাচার করছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটকের সামনের একটি মাটির রাস্তা ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করলে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি গাছের কাটা গোড়া দেখা যায়। একই সঙ্গে জঙ্গলের গভীরে ঝড়ে উপড়ে পড়া শতবর্ষী দুটি বড় সেগুন গাছও চোখে পড়ে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যথাযথ তদারকি না থাকলে ঝড়ে পড়ে থাকা এসব মূল্যবান গাছও কাঠচোরদের হাতে চলে যেতে পারে। তাদের অভিযোগ, বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরেই গাছ কাটার ঘটনা ঘটলেও তা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লাউয়াছড়া বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হক। তিনি বলেন, “প্রতিদিনই টহল জোরদার রয়েছে। কাঠ পাচারের কোনো সুযোগ নেই। কোথাও গাছ কাটার সংবাদ পেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করা হয়। প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়। ঝড়ে পড়ে থাকা গাছগুলো গভীর জঙ্গলে থাকায় রেঞ্জ অফিসে আনার ব্যবস্থা নেই।”
রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) প্রীতম বড়ুয়া বলেন, “রাজকান্দি রেঞ্জের আওতাধীন বনাঞ্চল অত্যন্ত বিস্তৃত। লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট তুলনামূলকভাবে কম হলেও কাঠ ও বাঁশ চোরদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।”
পরিবেশবিদদের মতে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এখানে নির্বিচারে গাছ কাটা অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের মতে, শুধু টহল বাড়ালেই হবে না, বনাঞ্চলে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু, জনবল বৃদ্ধি এবং কাঠ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বন রক্ষার প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে গাছ কাটা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ পাওয়া স্থানগুলোতে বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ লাউয়াছড়া শুধু একটি বন নয়, এটি দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ।



