সবুজ-হলুদের এক টুকরো ব্রাজিল, সিলেটের মাছিমপুরে
মাছিমপুরে ঢোকার মুখে হঠাৎই চোখ আটকে গেল। দূর থেকে মনে হলো, যেন কোনো বাড়ি নয়, ব্রাজিলের পতাকাই দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। সবুজ আর হলুদের এমন ছড়াছড়ি যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলেই যেতে হয়, আমি সিলেটেই আছি।
আরও কাছে গিয়ে দেখলাম, শুধু দেয়াল নয়, বারান্দা, ছাউনি, গেট, এমনকি পাশের দোকানের শাটারেও একই রঙের ছোঁয়া। পুরো বাড়িটাই যেন ব্রাজিল ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসার এক বিশাল ক্যানভাস।
স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নামেই পরিচিত।
বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে এলেই বাংলাদেশজুড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা উড়তে দেখা যায়। কিন্তু মাছিমপুরের এই বাড়ির গল্পটা একটু ভিন্ন। এখানে পতাকা কয়েক দিনের জন্য টানানো হয়নি, বরং প্রিয় দলের রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো বাড়ি।
বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় পরিবারের সদস্যরা মিলে বাড়িটি এভাবে রং করেন।
“তখন থেকেই মানুষ এটাকে ব্রাজিল বাড়ি বলতে শুরু করে। এখন দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে দেখতে আসে,” বললেন তিনি।
আসলে বাড়িটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই বোঝা যায়, এটি কেবল রং করার বিষয় নয়। এর পেছনে আছে এক ধরনের আবেগ। ফুটবলকে ঘিরে যে ভালোবাসা বাংলাদেশে তৈরি হয়, তারই এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ যেন এই বাড়ি।
বাড়িটির অন্যতম সদস্য সাজ্জাদুর রহমান টিপু জানালেন, পরিবারের প্রায় সবাই ব্রাজিলের সমর্থক। সেই ভালোবাসা থেকেই এমন উদ্যোগ।
“আমরা ব্রাজিলের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব। পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েই বাড়িটি রং করেছি,” বললেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটি সাজাতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। তবে শুধু ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা নয়, দেশের প্রতিও ভালোবাসার প্রকাশ রাখার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। তাই বাড়ির নকশার বিভিন্ন অংশে বাংলাদেশের পতাকার প্রতীকও রাখা হয়েছে।
কথা বলতে বলতে কয়েকজন কিশোরকে দেখা গেল বাড়ির সামনে ছবি তুলতে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ এখানে আসে। কেউ ছবি তোলে, কেউ ভিডিও করে, আবার কেউ শুধু কৌতূহল মেটাতে ঘুরে যায়।
পাশের একটি দোকানে বসা মাজহারুল ইসলাম বললেন, “আগে মাছিমপুরের এই জায়গাটা এভাবে কেউ চিনত না। এখন অনেকে শুধু ব্রাজিল বাড়ি দেখতে আসে।”
মজার বিষয় হলো, বাড়িটির সবচেয়ে বড় ভক্তদের সবাই যে ব্রাজিল সমর্থক, তা নয়। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা আছে।
স্থানীয় এক তরুণ হেসে বললেন, “আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। কিন্তু একজন সমর্থক তার দলকে কতটা ভালোবাসতে পারে, এই বাড়ি তার উদাহরণ।”
বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বুঝলাম, এটি আসলে শুধু একটি রঙিন বাড়ি নয়। এটি বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিরও একটি প্রতিচ্ছবি। এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের ফুটবল দলও মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
চার বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ্বকাপ এসেছে, গেছে। প্রিয় দল জিতেছে, হেরেছে। কিন্তু মাছিমপুরের এই বাড়ির রং এখনো ফিকে হয়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে এলাকার এক পরিচিত স্থাপনা। এখন কেউ ঠিকানা জানতে চাইলে অনেকেই রাস্তার নামের আগে বলেন, “ব্রাজিল বাড়ির কাছে চলে আসেন।”
একটি ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে শুরু হওয়া গল্প এভাবেই ধীরে ধীরে একটি বাড়িকে পরিণত করেছে মাছিমপুরের অন্যতম পরিচিত ল্যান্ডমার্কে।



