১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার সিলেট বোর্ডে, তবু বেড়েছে জিপিএ-৫
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবার মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধস নেমেছে। এ বছর বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সর্বশেষ ২০০৮ সালে সিলেট বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে পাসের হারে বড় পতন হলেও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ৩ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ বেড়েছে ২২২টি।
সোমবার সকালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের সচিব চৌধুরী মামুন আকবর। এ সময় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে বোর্ডে পাসের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা আরও ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ গত পাঁচ বছর ধরেই সিলেট বোর্ডে পাসের হার নিম্নমুখী। এবার সেই পতন সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের চিত্রে দেখা যায়, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের শুরুর দিকের বছরগুলোতে পাসের হার আরও কম ছিল। ২০০১ সালে পাসের হার ছিল মাত্র ৩৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র দুজন শিক্ষার্থী।
২০০২ সালে পাসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ওই বছর জিপিএ-৫ পায় ১৮ জন। ২০০৩ সালে পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১০ জন। ২০০৪ সালে পাসের হার বেড়ে ৫২ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায় এবং জিপিএ-৫ পায় ৩৪৮ জন। পরের বছর, ২০০৫ সালে পাসের হার আবার কমে ৪৮ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে যায়। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪৭৩ জন।
পরবর্তী সময়ে ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। ২০০৯ সালে সিলেট বোর্ডে পাসের হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। একই বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়ে হয় ১ হাজার ৮৯৬।
এবার পাসের হারে বড় ধস নামলেও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ৩ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৭৪৫ জন ছেলে এবং ২ হাজার ৯১ জন মেয়ে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এই বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৬০৮ জন। এর মধ্যে ছেলে ১ হাজার ৬৮৪ জন এবং মেয়ে ১ হাজার ৯২৪ জন।
মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২০ জন। তাদের মধ্যে ছেলে ২৪ জন এবং মেয়ে ৯৬ জন। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৮ জন। এর মধ্যে ছেলে ৩৭ জন এবং মেয়ে ৭১ জন।
তবে কয়েক বছর আগের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনও অনেক কম। ২০২২ সালে সিলেট বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৭ হাজার ৫৬৫ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৫২, ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৭১ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬১৪ জন।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মানবিক বিভাগে। এই বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিক বিভাগে পাস করা শিক্ষার্থীর চেয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি।
মানবিক বিভাগে এবার ৫৭ হাজার ৭৬০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ২৭ হাজার ৮১৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ২৯ হাজার ৯৪৫ জন। এ বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং মেয়েদের ৫০ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ।
সামগ্রিক ফলাফলেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। এবার মেয়েদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ, আর ছেলেদের ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ৮৯ হাজার ৬৮৬ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। এর মধ্যে ৮৯ হাজার ৭৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন।
পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ১৯ হাজার ৮৮৯ জন এবং মেয়ে ৩২ হাজার ৬৮ জন।।
পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বোর্ড কর্মকর্তারা। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ দুই বিষয়ে দুর্বলতা বেশি বলে মনে করছেন তারা। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিও ফল খারাপ হওয়ার একটি কারণ।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন বলেন, এবার পরীক্ষার্থীদের দুই বছরে দুই ধরনের সিলেবাসে পড়তে হয়েছে। এর প্রভাব ফলাফলে পড়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষা কঠোরভাবে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিও রয়েছে। দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে ফলাফল আরও ভালো করা সম্ভব।
চার জেলার মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে সিলেট জেলা। এ জেলায় পাসের হার ৬৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এরপর মৌলভীবাজারে ৫৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং সুনামগঞ্জে ৫৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার হবিগঞ্জে, ৫৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।
সিলেট জেলায় ৩৫ হাজার ২৪০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ২২ হাজার ১৬০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২৩ জন।
মৌলভীবাজারে ১৯ হাজার ৮৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ হাজার ১০৩ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭২৫ জন। সুনামগঞ্জে ১৮ হাজার ২৮৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৯ হাজার ৯৯৯ জন। হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৬৯৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৮ হাজার ৬৯৫ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭৫ জন।
এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল সাতটি। তবে এবার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়নি।
সব মিলিয়ে এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দুই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। একদিকে পাসের হার নেমে এসেছে গত ১৮ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, অন্যদিকে গত বছরের তুলনায় বেড়েছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তবে ধারাবাহিকভাবে পাসের হার কমতে থাকা এবং বিশেষ করে মানবিক বিভাগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সিলেটের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।




