তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সিলেটজুড়ে দুর্ভোগ
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সিলেটের মানুষ। নগর থেকে গ্রাম, প্রায় সর্বত্রই অনিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে কিংবা কখন ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা মিলছে না। এতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের অন্তত তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণেই এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।
গত রবিবার ও সোমবার সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল ভোগান্তিকর। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দীর্ঘ সময় পর ফিরেছে। আবার বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হয়েছে অল্প সময়। ফলে দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়তে হয়েছে বাসিন্দাদের।
নগরের লালবাজার এলাকার প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায়ী একাত্তর অফসেট প্রেসের স্বত্বাধিকারী কবির আহমদ বলেন, এ বছর এমনিতেই ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। এর মধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ আসার পর ২০ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি থাকে না। মেশিন প্রস্তুত করে চালু করতেই কিছুটা সময় লাগে। এর মধ্যেই আবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এমনিতেই ব্যবসায় খরা, তার ওপর যে টুকটাক কাজ আছে, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে সেগুলোও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাব, জানি না।’
জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ীদেরও একই অভিযোগ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফেবজ-এর স্বত্বাধিকারী আতিক হাসান মিল্টন বলেন, ‘আমার ডিটিএফ প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা। কারেন্ট ছাড়া তো মেশিন চলে না। কারেন্ট না থাকলে একরকম মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এই যে বারবার আসা-যাওয়া করে, এতে কাজ করা যায় না। কাস্টমারদেরও কিছু বোঝানো যায় না। মাসের ভাড়া কীভাবে উঠবে, কর্মচারীদের বেতন কীভাবে দেব, তা নিয়েই চিন্তায় আছি।’
নগরের বড়বাজার আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রাহাত বলেন, ‘একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে আসে। কিন্তু আধা ঘণ্টাও থাকে না। আবার চলে গেলে কখন ফিরবে, তারও ঠিক নেই।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।’
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা সাতটায় পিক আওয়ারে সিলেট নগরে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩৫ মেগাওয়াট।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. জারজিসুর রহমান রনি বলেন, ‘আমরা যা পাচ্ছি, তাই বিতরণ করছি।’
তবে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
সিলেট বিভাগের পিডিবির আওতাধীন চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ২৫২ মেগাওয়াট। রোববার এ চার জেলায় সরবরাহ ছিল ১৯৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৫৩ মেগাওয়াট।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, কী কারণে সরবরাহ কম, তা তিনি জানেন না। তবে যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তা সুষমভাবে বিতরণ করা হচ্ছে।
রবিবারের তুলনায় সোমবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, সোমবার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল।
গ্রামেও একই চিত্র
নগরের বাইরে গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বড় একটি সময় তাঁদের বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার পংকজ চৌধুরী জানান, পিক আওয়ারে তাঁদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২৩ মেগাওয়াট।
এ সমিতির আওতাধীন কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের গ্রাহকেরা তাই বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রয়েছেন।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলাতেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বন্ধ তিন বিদ্যুৎকেন্দ্র
বিদ্যুৎ বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের অন্তত তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জের একটি, বিবিয়ানার একটি এবং শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
কেন্দ্রগুলো ঠিক কী কারণে বন্ধ রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি সূত্রটি। তবে গ্যাস সংকটের কারণেই উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে চালু হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ফলে তীব্র গরমের মধ্যে সিলেটজুড়ে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি, উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ থাকা এবং গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো আশ্বাস দিতে পারছেন না বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।




