চুনাপাথর আমদানিতেই সীমাবদ্ধ ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর, রপ্তানিতে শূন্য
সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের পাশে কাঁচঘেরা তিনটি ভবন রোদে ঝকমক করে। সামনে ফুলের বাগান, ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করিডর, পেছনে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিস্তীর্ণ শূন্যরেখা। ১৭৫ কোটি টাকা খরচ করে গড়া এই স্থাপনার নাম ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর। কিন্তু বন্দরের ভেতরে হাঁটলে বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন দেয়ালের আড়ালে একধরনের নিস্তব্ধতা জমে আছে। কর্মচাঞ্চল্যহীন করিডর, ফাঁকা গেস্ট হাউস, আর মসজিদ ও একটি রেস্তোরাঁ ছাড়া প্রায় অব্যবহৃত প্রতিটি ভবন।
অথচ এই সীমান্ত পথে বাণিজ্য চলছে প্রায় দুই দশক ধরে। ২০০৫ সাল থেকে ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতের মেঘালয়ের খাসি হিলস থেকে চুনাপাথর আসছে বাংলাদেশে। তামাবিল স্থলবন্দর ব্যবহার করলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার ঘুরপথ পাড়ি দিতে হয়। সেই দূরত্ব এড়াতেই ভোলাগঞ্জ পথ বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। ২০১৯ সালে সরকার এই শুল্ক স্টেশনকেই স্থলবন্দরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিশ্রুতি দেয়, এই পথ খুলে দেবে দুই দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্যদ্বার।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় বন্দরটির। আট মাস পার হলেও চিত্র বদলায়নি এতটুকু। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক—প্রতিটিতে ১১ থেকে ১২ টন—চুনাপাথর ঢোকে বন্দর দিয়ে। এই সংখ্যা শুল্ক স্টেশন থাকাকালেও একই ছিল। অর্থাৎ স্থলবন্দর হওয়ার পর আমদানির পরিমাণ বাড়েনি এক টনও, আর রপ্তানি বলতে এখনো কিছুই নেই।
ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাহাব উদ্দিন বলেন, “তৎকালীন সরকার ভারতকে খুশি করতে এই বন্দর করেছে। চুনাপাথর ছাড়া অন্য কিছু আমদানি হয় না, তা জানার পরও এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মূলত লুটপাটই ছিল উদ্দেশ্য।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মুর্শেদ আলমের কথাতেও একই সুর, “বিশ বছর ধরেই শুধু চুনাপাথরই আমদানি হচ্ছে, অন্য কোনো পণ্য না।”
সমস্যাটা একতরফা নয়, সীমান্তের ওপারেও প্রতিফলিত। ভারত অংশে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো শুল্ক স্টেশন বা বন্দর—দুই দেশের বাণিজ্য কাঠামোর এই অসামঞ্জস্যই ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশ অংশের এই বিনিয়োগ কতটা একতরফা পরিকল্পনার ফসল।
বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য পুরো ব্যর্থতা মানতে নারাজ। ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুরোদমে চলছে এবং সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। ব্যবসায়ীরাই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অন্য পণ্যে। বন্দরের ক্যাফেটেরিয়া এ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে মাসে দুই লাখ ১৯ হাজার টাকায়, সেখানে চলছে একটি রেস্তোরাঁ।’
সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের কথা মাথায় রেখে বন্দরের ভেতরে গড়া হয়েছিল ক্যাফেটেরিয়া, গেস্ট হাউস, দুটি ডরমেটরি, ক্লিনিক। পর্যটকদের জন্য এক সম্পূর্ণ বন্দোবস্ত। কিন্তু বাস্তবে মসজিদ আর একটি রেস্তোরাঁ ছাড়া এসব সুবিধার প্রায় কিছুই কাজে লাগছে না।
ফলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, ১৭৫ কোটি টাকার এই অবকাঠামো কার জন্য? কিসের জন্য তৈরি হয়েছিল? চুনাপাথরবাহী ট্রাকের সারি প্রতিদিন যেমন ঢুকছিল শুল্ক স্টেশনের আমলে, তেমনই ঢুকছে আজও, শুধু পেছনের ভবনগুলো বদলে গেছে, বদলায়নি বাণিজ্যের চরিত্র।




