ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ‘মৃত্যুপুরী’, ১৫ দিনে প্রাণ গেল ১৫ জনের
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক যেন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুর সড়কে। একের পর এক দুর্ঘটনা, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে এই মহাসড়কের সিলেটের ওসমানীনগর অংশে প্রাণ গেছে ১৫ জনের। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ, একই পরিবারের একাধিক সদস্যও।
দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে, এরপর সবকিছু থেমে যায়। কিন্তু থামে না দুর্ঘটনা। থামে না স্বজনদের কান্না। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ একের পর এক প্রাণহানির পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে ওসমানীনগর অংশ যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুকূপ। সর্বশেষ শনিবার তেলবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তিনটি পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৫ জনের।
এর আগে গত ৭ আগস্ট ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ৯ জন। এরপর ১৪ আগস্ট একই মহাসড়কে বাসচাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ শনিবার প্রাণ গেল আরও চারজনের।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও ঝুলে আছে
গত ৭ আগস্ট ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হওয়ার পর ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৮ আগস্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সে হিসাবে ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও শনিবার পর্যন্ত তা জমা হয়নি।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক পিংকি সাহা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা দেওয়া হয়নি। চলতি সপ্তাহেই প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে জমা না পড়ায় দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
১৫ দিনে তিন দুর্ঘটনা
গত ৭ আগস্ট শুক্রবার সকালে ওসমানীনগরের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের চলাচল নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এর এক সপ্তাহ পর, ১৪ আগস্ট একই মহাসড়কে বাসের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়।
এরপর শনিবার, ২২ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে ওসমানীনগরের ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী একটি তেলবাহী ট্রাকের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামশী গ্রামের মৃত গফুর মিয়ার ছেলে মো. নিয়ামত (৪৫), তাঁর স্ত্রী উসুফা বেগম, মেয়ে আয়শা আক্তার (৫) এবং অটোরিকশাচালক সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার শেরপুর মাঝেরবাড়ী গ্রামের মো. লালন মিয়া (২৬)।
নিয়ামত ও উসুফা দম্পতির আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নিহত নিয়ামতের মামা আব্দুল আউয়াল বলেন, নিয়ামত ও উসুফা দীর্ঘদিন ধরে জগন্নাথপুরে বসবাস করছিলেন। তাঁদের মূল বাড়ি কিশোরগঞ্জে। শনিবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে জগন্নাথপুর যাচ্ছিলেন নিয়ামত। বাস থেকে অটোরিকশায় করে জগন্নাথপুর যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন তাঁরা।
পুলিশ জানায়, শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী পদ্মা কোম্পানির একটি তেলবাহী ট্রাকের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়।
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা বলেন, দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা
মাত্র ১৫ দিনে ১৫ প্রাণহানি শুধু পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনার হিসাব নয়, এটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় সংকটের চিত্রও তুলে ধরছে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও সুপারিশ বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, আরও কত প্রাণ গেলে এই মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাবে?




