ছাতকের ১৭৬ বছরের ‘ইংলিশ টিলা’ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
ছাতকের বাগবাড়ী এলাকায় ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ে একটি উঁচু টিলা। চারপাশে ঘরবাড়ি, টিলার ঢালে মানুষের বসতি। কোথাও টিলার মাটি কাটা, কোথাও সেই কাটা অংশে গড়ে উঠেছে বসতঘর। আর সবকিছুর ওপরে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো একটি স্থাপনা। স্থানীয়দের কাছে যার পরিচয় ‘সাহেব মিনার’।
কাছে গিয়ে স্থাপনাটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, সময় তার শরীরে কতটা ক্ষত তৈরি করেছে। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও বেরিয়ে এসেছে নির্মাণসামগ্রী। পুরো স্থাপনাটি একদিকে হেলে আছে। দেখে মনে হয়, আর কত দিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই।
অথচ এই স্থাপনাটি কোনো সাধারণ পুরোনো ভবন নয়। এর বয়স ১৭৬ বছর। ছাতকের শিল্পায়নের শুরুর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিস্তম্ভটি এখন নিজেই টিকে থাকার লড়াইয়ে। আরও অস্বস্তির বিষয় হলো, স্থাপনাটির চারপাশে যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁরাও নিরাপদ নন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিলার তিন দিক ঘিরে এখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসতি। বছরের পর বছর টিলার বিভিন্ন অংশ কেটে সেখানে ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। এতে টিলার স্বাভাবিক আকৃতি বদলে গেছে। কোথাও কোথাও ধসও নেমেছে।
বর্ষা এলে তাই শুধু বৃষ্টির পানি নিয়ে চিন্তা থাকে না বাসিন্দাদের। ভারী বৃষ্টিতে টিলা ধসে পড়বে কি না, সেই ভয়ও থাকে। আর টিলার চূড়ায় থাকা হেলে পড়া স্মৃতিস্তম্ভটি নিয়ে আশঙ্কা আরও বেশি।
বাগবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিনের কথায় সেই ভয় স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো এই স্থাপনাটি অনেক দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝখানে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। একদিকে হেলে আছে। যেকোনো সময় ধসে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
আরেক বাসিন্দা খায়ের উদ্দীনও দেখাচ্ছেন টিলার বিভিন্ন অংশের দিকে। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে টিলা কেটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে টিলার কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেখানে বসবাসকারীরাও আতঙ্কে থাকেন।
এক টিলায় দুই বিপদ
ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়ী এলাকায় প্রায় দুই একর ৬০ শতক খাস খতিয়ানভুক্ত জমির ওপর ইংলিশ টিলার অবস্থান। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু এই টিলার চূড়ায় রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার পাকা স্মৃতিস্তম্ভ।
একদিকে পুরোনো স্থাপনাটির দেয়ালে ফাটল ধরেছে। অন্যদিকে মানুষের বসতি গড়তে কাটা হচ্ছে টিলার মাটি। ফলে বিপদটা যেন দুই দিক থেকে আসছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভারী বৃষ্টি কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে স্থাপনাটি ধসে পড়তে পারে। আর সেটি ঘটলে শুধু ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা হারিয়ে যাবে না, আশপাশে থাকা মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ছাতককে ঘিরে ভূমিকম্পের উদ্বেগও নতুন নয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক বছরে একাধিকবার ছাতক উপজেলা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে হেলে পড়া স্থাপনাটিকে ঘিরে তাঁদের শঙ্কা আরও বেড়েছে।
এই টিলার নাম কেন ইংলিশ টিলা?
আজকের বাগবাড়ীর এই টিলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দী আগের একটি গল্প।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড থেকে ছাতকে এসেছিলেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জর্জ ইংলিশ। তাঁর হাত ধরেই এ অঞ্চলে চুন ও চুনাপাথরের ব্যবসার বিস্তার ঘটে।
তখনকার ছাতক আজকের মতো ছিল না। কিন্তু চুন ও চুনাপাথরের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় জর্জ ইংলিশের নামও।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ৭৬ বছর বয়সে ১৮৫০ সালে ছাতকেই মারা যান জর্জ ইংলিশ। তাঁর স্ত্রী হেসরি তাঁকে এই টিলায় সমাহিত করেন। একই বছর সমাধির পাশে তৈরি করা হয় চারকোণা আকৃতির একটি স্মৃতিস্তম্ভ। সময়ের সঙ্গে সেই জায়গার পরিচয় হয়ে যায় ‘ইংলিশ টিলা’ নামে।
পরে হেসরি ইংল্যান্ডে ফিরে যান। জায়গাটি চলে যায় সরকারি খাস জমির আওতায়। কিন্তু থেকে যায় জর্জ ইংলিশের সমাধি এবং তাঁর স্মৃতি বহন করা সেই স্থাপনাটি।
১৮৫০ সালে নির্মিত সেই স্মৃতিস্তম্ভই আজ ১৭৬ বছর পর এসে দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের মুখে।
ইতিহাস আছে, নেই সংরক্ষণ
বাগবাড়ীর টিলায় দাঁড়িয়ে পুরোনো স্থাপনাটির দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো সময়ের ছাপ। কোথাও ফাটল, কোথাও খসে পড়া অংশ। দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়েছে।
আর চারপাশের পরিবর্তনও কম নয়। একসময় যে টিলা ছিল বিস্তৃত ও স্বাভাবিক আকৃতির, মানুষের বসতি আর মাটি কাটার কারণে তার চেহারাও বদলে গেছে।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আর কত দিন টিকে থাকবে?
স্থানীয়দের দাবি, শুধু স্থাপনাটির সংস্কার করলেই হবে না। টিলা কাটা বন্ধ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং পুরো এলাকাকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
কারণ ইংলিশ টিলা শুধু একটি পুরোনো টিলা নয়। এটি ছাতকের শিল্পায়নের শুরুর ইতিহাসের সাক্ষী। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থেকে এটি দেখেছে এই জনপদের পরিবর্তন। এখন সেই ইতিহাসের সাক্ষী নিজেই ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দীন বলেন, ‘ছাতকের ১৭৬ বছরের পুরোনো ইংলিশ টিলা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাস বাস্তবে কত দ্রুত রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কারণ টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘সাহেব মিনার’ হয়তো আর বেশি সময় অপেক্ষা করবে না। ফাটলগুলো প্রতিদিনই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইতিহাস সংরক্ষণে দেরি করলে একসময় সংরক্ষণের মতো ইতিহাসও আর অবশিষ্ট থাকে না।




