সিলেট নগরে শিক্ষক-ব্যবসায়ীসহ একদিনে চার মৃত্যু
একটি শহরের প্রতিটি সকাল একই রকম শুরু হয় না। কোথাও স্কুলের ঘণ্টা বাজে, কোথাও দোকানের শাটার ওঠে, কোথাও পরিবারের কেউ অফিসের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সিলেট নগরে দিনটি যেন একের পর এক মৃত্যুসংবাদ নিয়েই হাজির হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও দুই যুবকের মৃত্যুতে নগরজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দুটি মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায়, আর দুটি ঘটনায় বাসা ও হোটেল কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মরদেহ। সবকটি ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ব্লু বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুরাদ আহমদ (৫৭) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, প্রতিদিনের মতো সকালে বিদ্যালয়ে এসে ক্লাস নেন তিনি। পরে বেতনের চেক ব্যাংকে জমা দিতে বের হন। স্কুলসংলগ্ন বাংলাদেশ বেতারের সামনে সড়ক পার হওয়ার সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা ওই অটোরিকশাতেই তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মুরাদ আহমদের মাত্র তিন মাস পর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। তিনি দুই কন্যাসন্তানের জনক। বড় মেয়ে লিডিং ইউনিভার্সিটিতে এবং ছোট মেয়ে ব্লু বার্ড স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান বলেন, “মাত্র তিন মাস পরই তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ এমন মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
একই সময়ের মধ্যে নগরের বন্দরবাজার এলাকার আলী আবাসিক হোটেল থেকে ব্যবসায়ী সোহেল আহমদ (৩৫) নামে এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
সোহেল জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবির হাওর এলাকার বাসিন্দা হলেও নগরের নয়াসড়কে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি হাসান মার্কেটে ব্রিফকেস ও ব্যাগের ব্যবসা করতেন।
পুলিশ জানায়, তিনি হোটেলের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। পরে দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মাঈনুল জাকির বলেন, ঘটনাটির আইনগত প্রক্রিয়া চলছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, নগরের উপশহর এলাকায় নিজ বাসা থেকে রাব্বী আহমদ (২৯) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে শাহপরান (রহ.) থানা পুলিশ। রাব্বী সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি পরিবারের সঙ্গে উপশহরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
পুলিশ জানায়, সকালে ঘুম থেকে না ওঠায় পরিবারের সদস্যরা ডাকাডাকি করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় তাকে দেখতে পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শাহপরান (রহ.) থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হবে।
দিনের চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে খাদিমপাড়া বিসিক শিল্প এলাকার সামনে। রাত প্রায় ১টার দিকে অজ্ঞাত একটি গাড়ির সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন শাহরিয়ার হাসান (২৬)।
তিনি খাদিমপাড়ার দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা। দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের চালকও গুরুতর আহত হয়েছেন।
পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠান। পরে ঘটনাস্থল থেকে শাহরিয়ারের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। পরিবারের আবেদনের পর মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শাহপরান (রহ.) থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
একই দিনে চারটি পৃথক ঘটনায় চারজনের মৃত্যু সিলেট নগরীতে শোকের আবহ তৈরি করেছে। এর মধ্যে দুটি মৃত্যু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে হোটেল ও বাসা থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন স্বজনরা।




