সিলেটের লোভাছড়া থেকে আটগ্রাম, ১৫ কিলোমিটার নদীপথে পাথর লুট
কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী লোভাছড়া থেকে জকিগঞ্জের আটগ্রাম বাজার। নদীপথে দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে অন্তত দেড় ঘণ্টা।
এই দীর্ঘ নদীপথে প্রতিদিন ছুটছে শত শত বারকি নৌকা। নৌকাগুলোতে বোঝাই করা হচ্ছে পাথর। লোভাছড়া থেকে লোভা ও সুরমা নদী হয়ে এসব পাথর পৌঁছাচ্ছে জকিগঞ্জের আটগ্রাম এলাকায়। সেখানে দিনের আলোতেই চলছে ক্রাশার মেশিন। পাথর ভেঙে ট্রাকে তোলা হচ্ছে, এরপর সেগুলো যাচ্ছে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
অথচ লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে এখন কোনো বৈধ ইজারা নেই। পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে দীর্ঘদিন ধরে কোয়ারিটি ইজারার বাইরে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও। তারপরও থামেনি পাথর উত্তোলন ও স্থানান্তর।
সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিন-রাত সমানতালে চলছে এই কার্যক্রম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান ও নজরদারি থাকলেও নানা কৌশলে পাথর উত্তোলন ও পাচার অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেও এই কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ করেছেন তারা।
কোয়ারি থেকে নৌকায়, নৌকা থেকে ক্রাশারে
লোভাছড়া সীমান্ত এলাকার দিকে তাকালে পাথর সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য এখনো চোখে পড়ে। বারকি নৌকায় করে পাথর তুলে নেওয়া হচ্ছে কোয়ারি এলাকা থেকে। এরপর নদীপথে কানাইঘাটের বিভিন্ন ঘাট পেরিয়ে সেগুলো পৌঁছে যাচ্ছে জকিগঞ্জের আটগ্রাম এলাকায়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, একটি নৌকা ভর্তি পাথর ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটি স্থানীয় পাথরখেকো চক্র এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঝখানে কিছুদিন পাথর লুটের পরিমাণ কম থাকলেও এখন আবার তা বেড়েছে।
আটগ্রাম বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লোভাছড়া থেকে আসা পাথর প্রকাশ্যেই ক্রাশার মেশিনে ভাঙা হচ্ছে। পরে এসব পাথর ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
অর্থাৎ উত্তোলন থেকে পরিবহন, এরপর ক্রাশিং ও সরবরাহ, পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। পার্থক্য শুধু, এর কোনো বৈধ ইজারা নেই।
আদালতের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি
লোভাছড়া পাথর কোয়ারির বিরুদ্ধে পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই কোয়ারিটি ইজারার বাইরে রয়েছে।
২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর সেখানে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করেছিল। পরে জব্দ করা পাথরের একাংশ নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে অবশিষ্ট পাথর নিয়েও পরে লুটের অভিযোগ ওঠে।
এরপর উচ্চ আদালত লোভাছড়া থেকে পাথর পরিবহন ও স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন।
২০২৫ সালে সরকার পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় লোভাছড়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাথর কোয়ারির ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রাখে। এর পরও কোয়ারি থেকে পাথর সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ থামেনি।
গত মে মাসে সিলেট বিভাগের পাথর ও বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারিগুলোর অবস্থা পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি লোভাছড়া পরিদর্শন করে। সিলেটের সাবেক বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা কোয়ারির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
‘কেউ যাতে বালু-পাথর নিতে না পারে, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’
লোভাছড়ায় ইজারা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস।
তিনি বলেন, ‘লোভাছড়ায় কোনো ইজারা নেই। এখন থেকে যাতে কেউ বালু-পাথর নিতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজিবিকেও বলা হয়েছে। এ নিয়ে নিয়মিত অভিযানও চলছে। এরপরও যদি কেউ পাথর নিয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আটগ্রামেও অভিযান, তবু বন্ধ হচ্ছে না
জকিগঞ্জের আটগ্রাম এলাকায় পাথর ক্রাশিং ও সরবরাহের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিত কুমার চন্দ বলেন, কয়েক দিন আগেও সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু লোভাছড়া থেকে পাথর আসা বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
অর্থাৎ একদিকে আটগ্রামে অভিযান চলছে, অন্যদিকে নদীপথে পাথর আসা অব্যাহত রয়েছে। ফলে একটি জায়গায় ব্যবস্থা নিলেও উৎসস্থল থেকে পাথর সরবরাহ বন্ধ না হওয়ায় পুরো কার্যক্রম থামানো যাচ্ছে না।
আরও কঠোর অভিযানের কথা ডিসির
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, লোভাছড়ার পাথর লুট বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্সের অভিযান চলছে।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
নিষেধাজ্ঞার পরও কেন এই পাথর লুট?
লোভাছড়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি এখন শুধু অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের নয়। প্রশ্ন হলো, একটি কোয়ারিতে বৈধ ইজারা নেই, আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, প্রশাসনের অভিযানও চলছে, তারপরও কীভাবে প্রতিদিন শত শত নৌকা পাথর নিয়ে কোয়ারি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে?
আর সেই পাথরই বা কীভাবে ১৫ কিলোমিটার নদীপথ পেরিয়ে আটগ্রামে পৌঁছে প্রকাশ্যে ক্রাশারে ভাঙা হচ্ছে?
উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে একটি পুরো সরবরাহব্যবস্থার চিত্র। কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন, নৌকায় পরিবহন, নদীপথে সরিয়ে নেওয়া, আটগ্রামে ক্রাশিং এবং পরে ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
প্রশাসন বলছে অভিযান চলছে, আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লোভাছড়া থেকে পাথর এখনো নদীপথে বের হচ্ছে।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে লোভাছড়ার পাথর লুট কতদিন চলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।




