ইঞ্জিন সংকটে কালনী এক্সপ্রেস, উঠলেই শুরু অপেক্ষা
টিকিট হাতে স্টেশনে অপেক্ষা। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। ডিজিটাল স্ক্রিনে কখনো নতুন সময় দেখায়, কখনো আগের সময়টিই থাকে। কিন্তু ট্রেনের দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত যখন কালনী এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে আসে, তখন অপেক্ষার সময় গুনতে গুনতে অনেক যাত্রীর আর ঘড়ির দিকে তাকানোরও আগ্রহ থাকে না।
ঢাকা-সিলেট রুটে একসময় দ্রুতগতির ট্রেন হিসেবে পরিচিত কালনী এক্সপ্রেসের এখনকার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ইঞ্জিন সংকটে নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয়, বাড়তি যাত্রাবিরতি, পুরোনো কোচ, বিনা টিকিটের যাত্রীর চাপ আর সংশ্লিষ্টদের আচরণে এই ট্রেনের সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে যাত্রীদের।
২০১২ সালের ১৫ মে ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রা শুরু করেছিল কালনী এক্সপ্রেস। তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চালু হওয়া ট্রেনটির শুরুতে যাত্রাবিরতি ছিল মাত্র চারটি স্টেশনে। সিলেট থেকে ঢাকা যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগত প্রায় ছয় ঘণ্টা।
সেই কালনী এখন থামে ১১টি স্টেশনে। সিলেট থেকে ঢাকার পথে মাইজগাঁও, কুলাউড়া, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল, শায়েস্তাগঞ্জ, হরষপুর, আজমপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদি ও ঢাকা এয়ারপোর্টে যাত্রাবিরতি দেয় ট্রেনটি।
স্টপেজ বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে যাত্রার সময়ও। নির্ধারিত সময় ছয় ঘণ্টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো দিন ঢাকা-সিলেট যাত্রায় ১০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে।
ইঞ্জিন এক, কাজ অনেক
কালনী এক্সপ্রেসের শিডিউল বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে ইঞ্জিন সংকট।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একই ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি তেলবাহী ট্রেনও পরিচালনা করা হয়। ফলে একটি ট্রেনের ইঞ্জিন অন্য কাজে গেলে কালনীর যাত্রা পিছিয়ে যায়। কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তাদের তথ্যেও এর প্রমাণ মেলে। গত শুক্রবার কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তেলবাহী ট্রেন নিয়ে আখাউড়ার উদ্দেশ্যে যায়। পরদিন শনিবার ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে সেটি সিলেটে ফিরে আসে। ফলে ওই দিন কালনী এক্সপ্রেস সিলেট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে।
দেরি যেন এখন নিয়ম
ঢাকা থেকে কালনী এক্সপ্রেসের নির্ধারিত ছাড়ার সময় বিকেল ২টা ৫৫ মিনিট। সিলেটে পৌঁছানোর কথা রাত ৯টা ৩০ মিনিটে।
কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের হিসাব বলছে, নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো যেন ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে ট্রেনটির ছাড়ার কথা ছিল বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে কমলাপুর থেকে ছাড়ে ট্রেনটি। রাত ১০টা ৪ মিনিটে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন ছাড়ার তথ্য পাওয়া যায়। অথচ তখন সিলেটে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময়ও পেরিয়ে গেছে।
এর কয়েক দিন আগের ঘটনাটিও একই রকম। ৩ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রথমে দেখানো হয়, বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে কালনী কমলাপুর ছাড়বে। সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর স্ক্রিন থেকে ট্রেন ছাড়ার সময়টিও সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে কমলাপুর ছাড়ে ট্রেনটি।
যাত্রীদের অভিযোগ, এত দেরির পরও কেন ট্রেন ছাড়ছে না, সে বিষয়ে তাদের নিয়মিত কোনো ঘোষণা বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না।
সাত দিনের হিসাবেও স্বস্তি নেই
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের রেকর্ডকৃত তথ্য আরও পরিষ্কার ছবি দিচ্ছে।
২৯ আগস্ট কালনী এক্সপ্রেস সিলেটে পৌঁছায় রাত ১১টা ২৫ মিনিটে। ৩০ আগস্ট রাত ১২টা ১০ মিনিটে, ৩১ আগস্ট রাত ১০টা ৪০ মিনিটে, ১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১০ মিনিটে, ২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৫ মিনিটে এবং ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ১৫ মিনিটে সিলেট পৌঁছায় ট্রেনটি।
অর্থাৎ নির্ধারিত রাত সাড়ে ৯টার বদলে কোনো দিন এক ঘণ্টা, কোনো দিন দুই ঘণ্টা, আবার কোনো দিন চার ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি হয়েছে।
এমন দেরিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন মাঝপথের যাত্রীরা। নির্ধারিত সময় ধরে স্টেশনে এসে বসে থাকতে হয় তাদের। আর সিলেটে আসা পর্যটকদের জন্য ভোগান্তিটা আরও বড়। রাত বাড়তে থাকায় অপরিচিত শহরে হোটেলে যাওয়াও হয়ে ওঠে বাড়তি ঝুঁকির।
টিকিট কেটেও শেষ পর্যন্ত বাসে
শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটের কালনীর টিকিট করেছিলেন তাহমিনা চৌধুরী। কিন্তু রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ট্রেনের দেখা পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাসে করে সিলেটে আসেন।
তাহমিনা বলেন, ‘যাত্রীদের নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে এলেও কোনো জবাবদিহিতা নেই। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
ঢাকা থেকে সিলেটে আসা যাত্রী দেলওয়ার হোসেনের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, কমলাপুর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে ট্রেন ছেড়েছে। কিন্তু কেন দেরি হয়েছে, সে বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা বা ঘোষণা দেয়নি।
চার স্টেশন থেকে ১১
কালনী এক্সপ্রেস চালুর সময় চারটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ১১ হয়েছে।
রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব ও হস্তক্ষেপে একের পর এক স্টপেজ বাড়ানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অনেকেই নিজের এলাকার কাছের স্টেশনে ট্রেন থামাতে চান। এভাবে যাত্রাবিরতি বাড়ানো এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার হরষপুর স্টেশনেও কালনীর যাত্রাবিরতি যুক্ত হয়েছে।
দায় কার?
ট্রেনের ভেতরে যাত্রী বসে আছেন। বাইরে স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাস্তব যাত্রার কোনো মিল নেই। একদিকে ইঞ্জিন সংকট, অন্যদিকে বাড়তি স্টপেজ। মাঝপথে ক্রসিংয়ের জন্য অপেক্ষা। সব মিলিয়ে দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে যে কালনী একসময় যাত্রীদের স্বস্তি দিয়েছিল, সেটিই এখন অপেক্ষার আরেক নাম হয়ে উঠছে।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম অবশ্য বলেন, সিলেট থেকে কালনী এক্সপ্রেস সঠিক সময়েই ছাড়ছে। ঢাকা থেকে ট্রেনটি দেরিতে আসায় সিলেটে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
স্টেশন ব্যবস্থাপক আরও বলেন, ২০১২ সালে কালনী এক্সপ্রেস চালুর সময় মাত্র চারটি স্টপেজ ছিল। এখন ১১টি স্টেশনে থামে। এতে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রার সময় বেড়েছে।
কিন্তু যাত্রীরা যে প্রশ্নটি তুলছেন, সেটি আরও সরল। একটি ট্রেনের সময়সূচি যদি যাত্রীকে নির্ভরতার বদলে অনিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সেটি দ্রুতগামী ট্রেন কি না, সেই প্রশ্নই কি আগে আসে না?
কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রীরা এখন সেই উত্তরই খুঁজছেন।




