কাঞ্চা সোনা!
✒️ তালুকদার রায়হান
কবি,সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব
২০১০ সালের শেষের দিকে বার্মিংহাম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের এরাইভাল লাউঞ্জে বাংলা মিডিয়ার সাংবাদিকগণ অপেক্ষমান। ভিআইপি ফটকের ভেতরে থাকা সস্ত্রীক তৎকালিন বাংলাদেশ সরকারের চিফ হুইপ বেরিয়ে আসছেন না সাংবাদিকদের জটলা এড়াতে। বাঙালি মগজ খাটিয়ে কোনরকম সিকিউরিটিদের বুঝিয়ে সুজিয়ে চট করে আমি ঢুকে পড়ি ভেতরে! আর এই কাঁচা বাঙালি মগজের সাথে তখন ছিলেন আরও একটি সুদক্ষ বাঙালি মগজের অধিকারী এনটিভির তৎকালিন হেড অব মিডল্যান্ডস সাংবাদিক। সাবেক চিফ হুইপ সাহেবের সামনে ক্যামেরা ধরেই প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন ছুঁড়তেই সাথে থাকা এনটিভির সাহসি সাংবাদিক স্বেচ্ছায় আমার ক্যামেরা ধরে রেকর্ড করতে সাহায্য করতে লাগলেন। ইন্টারভিউ শেষে যখন ফিরছি তখন বন্ধুসুলভ একটা হাসি দিয়ে হ্যান্ডশেক করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন – “আমি কায়ছারুল ইসলাম সুমন। এনটিভির ছোটখাটো সাংবাদিক!”
প্রতিত্তুরে বললাম – “আপনি তো জাদরেল সাংবাদিক ভাই। অনেক নামধাম শুনেছি। আমি সবেমাত্র এই লাইনে এসেছি। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে অনেক ধন্য বোধ করছি।”
-“অউ তো পাম্প মারি দিলা” – হাসির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে পিঠ চাপড়ে বলতে লাগলেন – “আফনে আজকে যেটা খরছইন ওটা অইলো সাংবাদিকতা! মিনমিনাইয়া এমপি মন্ত্রী হখলের ইন্টারভিউ নেওয়া সবেউ ফারে, আফনার ব্রাইট ফিউচার আছে ভাই, আমার সাহায্য লাগলে ফাইবা, আমারেও সাহায্য খরবা।”
— এভাবেই প্রথম পরিচয় ঘটে আমার সাথে সুমন ভাইয়ের। ঐদিন উনার কথায় যেভাবে অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলাম তা বুঝানো প্রায় অসম্ভব। পরিচয় হবার পর হতে প্রায়শই আমাদের ফোনে যোগাযোগ হতো। কথা হতো সংবাদ জগত, রাজনীতি, ব্যক্তিজীবন আরও অনেক প্রসঙ্গে। কথা বলতে বলতে কখন যে উনার সাথে বন্ধুসলভ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তা টেরও পাইনি। বাংলা প্রেসক্লাব, বার্মিংহাম-মিডল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠাকারীদের অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন তিনি। আমাকে তাদের সংগঠনে যুক্ত করতে রেখেছেন তিনি বিরাট ভূমিকা। সময়ের স্রোতে সুমন ভাই শুরু করলেন এটিএন বাংলা ইউকে’র সাথে পথচলা। আমাদের বিদ্যমান সম্পর্ক দৃঢ় হতে হয়ে উঠলো আরও সুদৃঢ়। মিডল্যান্ডসের বাংলা সাংবাদিকতায় এটিএন বাংলা ইউকের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে উনি সদা ছিলেন তৎপর যা উনার সাথে আলাপ আলোচনা, কাজের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে অনুধাবন করেছি।
সংবাদ জগতের বাইরে উনাকে যতটুক আমি দেখেছি তাতে এটা বলতে পারি যে, ‘স্পষ্টভাষী মানুষ অনেকেই আছেন কিন্তু সুমন ভাইয়ের মতো কড়া স্পষ্টভাষী মানুষ খুবই বিরল!’ আর এই গুণটার জন্য অনেকেই হয়তো তাঁকে অপছন্দ করতেন কিন্তু আমি ভালোবাসতাম প্রচণ্ড! কারণ, আমি ব্যক্তিগতভাবে আমি কড়া স্পষ্টভাষী না হলেও কিছুটা স্পষ্টভাষী। স্পষ্টভাষীতার পাশাপাশি উনি ছিলেন খুবই উদার কিন্তু রাগী! রাগী মানুষেরা যে কীরকম ভালো মানুষ হয় সেটা তারাই বলতে পারবে যারা উনার সাথে গভীরভাবে চলাফেরা করেছে।
বয়সের কিছুটা তফাত ছিলো আমাদের মাঝে কিন্তু সুমন ভাই বয়সের ব্যবধানকে তুচ্ছ করে সবসময় আমাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন যা উনার জীবদ্দশায় একাধিকবার বলেও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি কারণ, উনি বিশ্বাস করতেন বয়সে ছোট হলেও কাউকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলে ‘নিজের সম্মান’ বাড়ার সম্ভাবনা প্রচুর। সুমন ভাই সম্পর্কে লিখতে চাইলে একটা গল্পবই লেখা সম্ভব। যদি আল্লাহ্ চান, ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে আরও বড় আকারে লিখবো।
যুক্তরাজ্যে তখন ভোর বেলা। দুনিয়া থেকে প্রস্থান নেয়ার ৪/৫ দিন পূর্বে দেশ থেকে হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিলেন সুমন ভাই। ভোরবেলায় আমার রাত হয় দ্বিপ্রহর হয় সেটা উনি খুব ভালোভাবেই জানেন। দেশের নানাবিধ বিষয়আসয় নিয়ে আলাপের সূচনা করলে ঘুমে আচ্ছন্ন আমি অনুরোধের সুরে বলি – “ভাই, পরে মাতমু নে প্লীজ।”
“আইচ্ছা, অউ গান হুনিয়া ঘুমাই ঝাউক্কা” – একথা বলেই বন্ধুসুলভ হাসি দিয়ে গাইতে থাকলেন –
“বিনা দুধে দই পাতিয়া
তুইলাছে মাখন,
সেই মাখন ভক্ষন করিলে
ভবক্ষুধা থাকবে না।
আমার দয়াল পরশমনি গো
লোহারে বানাইলায় কাঞ্চা সোনা” …
ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে! আমার একটা দীর্ঘশ্বাস, একটা আফসোস আমার জন্যই উপহার রেখে প্রস্থান করলেন প্রিয় সুমন ভাই কিন্তু বিদায় নিতে পারেননি হৃদয় থেকে, বিদায় দিতে পারিনি, পারবোও না …


