গণ মানুষের জননেতা নাসির উদ্দিন চৌধুরী: এক জীবন্ত কিংবদন্তির উপাখ্যান
মনোয়ার হোসেন,বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে যারা নিছক রাজনীতিবিদ নন, বরং একেকটি দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন্ত ইতিহাস। সুনামগঞ্জের রাজনীতির আকাশে তেমনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম নাসির উদ্দিন চৌধুরী। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি একজন সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত হলেও, তার জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে এক লড়াকু যোদ্ধার গল্প।সংগ্রামের সূচনা ও সাহসিকতার পরিচয়
নাসির উদ্দিন চৌধুরীর সাহসিকতার শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। তৎকালীন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে যখন গোটা পাকিস্তান উত্তাল, তখন এই দুঃসাহসী ছাত্রনেতা স্বৈরাচার আইয়ুব খানের ওপর জুতা নিক্ষেপ করে প্রতিবাদের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। ছাত্রনেতা হিসেবে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে যখন তিনি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কলেজের ভিপি এবং জিএস নির্বাচিত হন।
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কৃতি খেলোয়াড়
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার টানে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিলেন লাল-সবুজের পতাকা। কেবল রাজনীতিতেই নয়, তিনি ছিলেন একজন কৃতি খেলোয়াড়ও। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি, যা আজ অনেকের কাছেই অজানা।
রাজনৈতিক চমক ও ‘এমপি সাহেব’ হয়ে ওঠা
নাসির উদ্দিন চৌধুরীর সংসদীয় জীবনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ১৯৯৬ সালের নির্বাচন। দিরাই-শাল্লার মাটিতে হেভিওয়েট নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তার প্রবল জনপ্রিয়তা দেখে স্বয়ং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন— “নাসির চৌধুরী একবার এমপি হয়েই সবার কাছে ‘এমপি সাহেব’ হয়ে গেছেন, আর আমাকে সবাই আজও কেবল ‘বাবু’ বলেই ডাকে।”
অদম্য মনোবল ও আপসহীন নেতৃত্ব
তিনি সেই নেতা, যিনি সুনামগঞ্জের রাজপথে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও জাতীয়তাবাদী আদর্শের ঝাণ্ডা নিয়ে বীরদর্পে লড়াই করেছেন। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে তিনি জেলায় অসংখ্য দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি করেছেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি আজ ইতিহাসের অংশ— “আমার ঘোড়া মরেছে, কিন্তু ঘোড়ার চাবুক মরে নাই।” তার সময়কালে দিরাই-শাল্লার দুর্নীতিবাজরা তটস্থ থাকতো।
২০২৬-এর মহাবিজয় ও জনগণের আস্থা
২০২৬সালের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-২ আসনে সারা বাংলাদেশের মানুষের নজর ছিল। জীবনের সায়াহ্নে এসে শারীরিক অসুস্থতাকে তুচ্ছ করে জনগণের অনুরোধে তিনি নির্বাচনে লড়েন। জামায়াত প্রার্থী জনাব শিশির মনির বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে এক বিশাল জয় ছিনিয়ে আনেন। এই জয়ের পর বিনয়ী এই নেতা বলেছিলেন— “এই বিজয় আমার নয়, এই বিজয় দিরাই-শাল্লার আপামর জনগণের বিজয়।” স্থানীয় নেতা ইমদাদুল হক লাভলু বলেন, এলাকাবাসী নিজ অর্থ ব্যয় করে তাদের প্রিয় নেতাকে বিজয়ী করে ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছেন।
জীবনের শেষ প্রান্তের তেজস্বী সেনাপতি
সাড়ে ছয় ফুটের সুঠাম দেহের অধিকারী এই মানুষটি আজ সড়ক দুর্ঘটনা, বাইপাস সার্জারি এবং প্যারালাইসিসের কারণে শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল। তবুও সম্প্রতি জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর তার ৭ মিনিটের শাণিত বক্তব্য প্রমাণ করেছে যে, তার তেজ কমেনি। সেই বক্তব্য যেমন বিরোধীদের সমালোচনার মোক্ষম জবাব দিয়েছে, তেমনি বোদ্ধা মহলে কুড়িয়েছে অশেষ প্রশংসা।
নাসির উদ্দিন চৌধুরী কেবল একজন সংসদ সদস্য নন, তিনি দিরাই-শাল্লা তথা পুরো সুনামগঞ্জের মানুষের আবেগের নাম। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন এই অকুতোভয় সেনাপতিকে পূর্ণ সুস্থতা দান করেন, যাতে তিনি সংসদকে আরও প্রাণবন্ত আলোচনায় মুখরিত রাখতে পারেন।


