টানা বৃষ্টিতে বাড়ছে নদীর পানি, সিলেটে বন্যা ও টিলা ধসের শঙ্কা: প্রস্তুত ৫৩৭ আশ্রয়কেন্দ্র
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সিলেটের আকাশ যেন ভারমুক্ত হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। এর সঙ্গে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে উঠতে শুরু করেছে সীমান্তবর্তী নদ-নদীগুলো। এখনো অধিকাংশ নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও কয়েকটি পয়েন্টে পানি দ্রুত বাড়ছে।
আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস বলছে, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সিলেটের সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলে দেখা দিতে পারে আকস্মিক বন্যা। একই সঙ্গে বেড়েছে পাহাড় ও টিলা ধসের আশঙ্কাও।
সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় এরই মধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। জেলার ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৬০টি টিলা এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ারও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রকাশিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর প্রভাবে পাহাড়ি ঢল নেমে সিলেটের নদ-নদীর পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিকাংশ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে অমলশিদ ও কানাইঘাটসহ কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং তা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। যদিও উজানের পানি দ্রুত মেঘনা অববাহিকায় নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি অন্তত দুই থেকে তিন দিনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, “আগামী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।”
এদিকে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার বলেন, সরকারি হিসাবে জেলায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা থাকলেও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩৮৬টি পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ টিলায় বসবাস করছে।
তিনি জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সিলেটে টিলা ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অতিবৃষ্টির পাশাপাশি অব্যাহতভাবে টিলা কাটার কারণে ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং অবৈধ টিলা কাটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, “মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে উজানের পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতির কথা জানিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনো খাবারের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা জানান, জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে। পাশাপাশি সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসের মধ্যে নদীর পানি, পাহাড়ি ঢল এবং টিলা ধসের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে প্রশাসন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে নিম্নাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।




