বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ
একতারা হাতে যে মানুষটি ঘুরে বেড়িয়েছেন সুনামগঞ্জের প্রান্তিক গ্রাম থেকে গ্রামে, তাঁর গান একসময় ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। প্রেম, বিরহ, মানুষের জীবনসংগ্রাম, সমাজের বৈষম্য আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর সহজ-সরল কথার গান হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের জীবনেরই অংশ। তিনি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা লোকসংগীতের এই কিংবদন্তি। তাঁর চলে যাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়, কিন্তু তাঁর গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির শৈশব কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর সংগীতের প্রতি আকর্ষণকে থামাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই একতারা হাতে তিনি ছুটে বেড়াতেন, আর ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন বাউল ও আধ্যাত্মিক সংগীতের সাধনায়।
কমর উদ্দিন, রশিদ উদ্দিন ও শাহ ইব্রাহিম মোস্তান বকসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সংগীতের জগতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। একই সঙ্গে ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ ও দুদ্দু শাহর দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই প্রভাবকে নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে শাহ আবদুল করিম তৈরি করেন নিজস্ব সংগীতভুবন।
তাঁর গানে ছিল মাটির মানুষের কথা। ছিল ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের অনুভূতি, জীবনের টানাপোড়েন। আবার অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও ছিল স্পষ্ট প্রতিবাদ।
‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না’সহ অসংখ্য গান তাঁকে মানুষের কাছে অমর করে রেখেছে। তাঁর গান একদিকে যেমন গ্রামীণ বাংলার জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক সময়েও লোকসংগীতকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেও সংগীতচর্চা থেকে কখনো সরে যাননি শাহ আবদুল করিম। নিজের চারপাশের মানুষের জীবন, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা ও সমাজের বাস্তবতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর গানের প্রধান উপাদান।
লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০০১ সালে লাভ করেন একুশে পদক। এ ছাড়া রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ড, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা এবং সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।
শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর পরও তাঁর গান থেমে নেই। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে, মঞ্চে ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও নতুন করে ফিরে আসছে তাঁর সৃষ্টি।
সুনামগঞ্জের উজানধলের সেই একতারা হাতে মানুষটি আজ নেই। কিন্তু তাঁর গান রয়ে গেছে। আর সেই গানেই বারবার ফিরে আসে বাংলার মাটি, মানুষ ও জীবনের গল্প।




