সীমান্তের ওপারে ‘পাথর উত্তোলন’, পলি জমে গভীরতা হারাচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওর
বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর টাঙ্গুয়ার হাওর। বিশাল জলরাশি, মাছের বিচরণ আর অতিথি পাখির আনাগোনায় তখন এর রূপ বদলে যায়। কিন্তু পানির নিচে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে হাওরের আরেকটি চিত্র। বিভিন্ন বিল ও খালে জমছে পলি, উঁচু হচ্ছে তলদেশ। কমছে পানির গভীরতা।
এর প্রভাব শুধু নৌযান চলাচলেই নয়, হাওরের পানিধারণ ক্ষমতা ও মাছের আবাসস্থল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জেলে ও হাওরপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় হাওরের কিছু অংশে পলি জমার প্রবণতা বেড়েছে। বর্ষা শেষে পানি নেমে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে আয়োজিত এক পরামর্শ সভাতেও পলি জমে বিভিন্ন খাল-বিল ভরাট হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও জলাধারের ধারণক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় জায়গায় খাল ও বিলের নাব্য ফিরিয়ে আনা জরুরি।
স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ এই পলি আসার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার পাথর উত্তোলনের কথা বলছেন। তাদের ধারণা, সীমান্তের ওপারে পাহাড় ও মাটি কাটার ফলে সৃষ্ট মাটি-পলি পানির প্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশে এসে হাওরে জমতে পারে।
তবে পাথর উত্তোলনের সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরে পলি জমার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিষয়টি শুধু অভিযোগ হিসেবে না রেখে কোথা থেকে, কীভাবে এবং কোন পথে পলি হাওরে ঢুকছে, তা যাচাই করে দেখার দাবি উঠেছে।
‘বাপ-দাদার সময় বড় বড় মাছ ধরা পড়ত’
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ শীর্ষক পরামর্শ সভা ও কর্মশালা হয়। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম প্রধান অতিথি ছিলেন।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে পলি জমে হাওরের বিভিন্ন বিলের পানিধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। আলোচনায় প্রয়োজনীয় জায়গায় খাল-বিল খননের কথাও বলা হয়।
হাওরের জেলে আবদুর রজ্জাক বলেন, “আমার বাপ-দাদার সময় এখানে বড় বড় মাছ ধরা পড়ত। এখন পলিতে ভরে গেছে সব। আগে হাওরের অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় গভীর পানি থাকত। সেসব জায়গায় মাছও বেশি পাওয়া যেত। এখন অনেক স্থানে পলি জমে পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় মাছের বিচরণক্ষেত্রও ছোট হয়ে এসেছে।”
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, হাওরের গভীর অংশগুলো শুষ্ক মৌসুমে মাছের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এসব জায়গায় পানির গভীরতা কমে গেলে মাছের নিরাপদ আবাসস্থলও সংকুচিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে হাওরের মৎস্যসম্পদের ওপর।
সীমান্তের পাথর উত্তোলনের অভিযোগ
সিল্টেশন বা পলি জমার বিষয়টি নিয়ে হাওরপাড়ের মানুষের কাছ থেকেও নানা অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ড. ফাহমিদা খানম।
তিনি বলেন, “হাওরের যেসব জায়গায় খনন প্রয়োজন সেগুলোতে ব্যাপক সিল্টেশন হয়েছে।”
গত তিন-চার বছরে সিল্টেশন বেড়ে যাওয়ার কথা গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেও শুনেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের সীমান্তের ওপারে বোমা মেরে পাথর উত্তোলনের কারণে সিল্টেশন বাড়তে পারে এমন কথাও স্থানীয়রা তাঁকে জানিয়েছেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সীমান্তের ওপারে পাথর উত্তোলনের সঙ্গে হাওরে পলি জমার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আরও যাচাই করা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
সিল্টেশন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তিনি বলেন, “সিল্টেশন সমস্যার সমাধানে দেশের ভেতরে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে হবে।”
শুধু পলি সরালেই হবে না
হাওরের খাল ও বিল পলি জমে ভরাট হয়ে গেলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধারণের সক্ষমতা কমতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি দ্রুত নেমে গেলে গভীর জলাধারের সংকট তৈরি হতে পারে। এ কারণে শুধু পলি অপসারণ নয়, পলি কোথা থেকে আসছে এবং কোন পথে হাওরে ঢুকছে, সেটিও চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কর্মশালায় হাওরের খাল-বিল খননের পাশাপাশি স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ড. ফাহমিদা খানম এর আগে হাওরপাড়ের মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শোনেন। স্থানীয়রা হাওরের পানি, মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক শাহেদা বেগম কর্মশালায় টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। হাওরের প্রতিবেশ রক্ষা, জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পর্যটনের চাপও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট শুধু পলি জমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মশালায় পর্যটনের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ও আলোচনায় আসে।
হাউসবোট নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান ড. ফাহমিদা খানম।
তিনি বলেন, “পর্যটনের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলোও হাওরের জন্য উদ্বেগজনক।”
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের মানুষের জীবিকার উৎস নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের একটি আশ্রয়স্থলও। ফলে এর গভীরতা কমে যাওয়া বা পানিধারণ ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি কেবল নৌযান চলাচল কিংবা মাছ ধরার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
হাওরের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখন তাই প্রশ্ন উঠছে, পলি জমছে কেন, কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে তা ঠেকানো যায়। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওরকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষার প্রথম ধাপ।




