সিলেটে ছয় বছরে মায়ের গর্ভেই মৃত্যু ১০ হাজারের বেশি অনাগত শিশুর
সিলেটের সীমান্তঘেঁষা এক গ্রামের ছোট্ট একটি ঘরে তখন নতুন অতিথিকে ঘিরে ব্যস্ততা। গর্ভের বয়স প্রায় নয় মাস। পরিবারের সবাই বিশ্বাস করছিল, আর কয়েক দিনের মধ্যেই ভেসে উঠবে নবজাতকের কান্না। শিশুর নামও ঠিক করা হয়েছিল। ছোট ছোট কাপড়ও কিনে রাখা হয়েছিল আগেই। কিন্তু সেই কান্না আর শোনা যায়নি। প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মায়ের গর্ভেই থেমে যায় শিশুটির হৃদস্পন্দন।
এটি সিলেট বিভাগের হাজারো পরিবারের নীরব শোকের প্রতিচ্ছবি, যাদের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারিয়ে গেছে। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে অন্তত ১০ হাজার ১৮৮টি অনাগত শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৭০০টি, প্রতি মাসে প্রায় ১৪০টি এবং প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি অনাগত প্রাণ জন্মের আগেই ঝরে পড়ছে।
তবে সরকারি হিসাবই পুরো চিত্র নয়। বাড়িতে, বেসরকারি ক্লিনিকে কিংবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে ঘটে যাওয়া অনেক মাতৃগর্ভের শিশুমৃত্যুর তথ্য কখনো সরকারি খাতায় ওঠে না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভাগের চার জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মাতৃগর্ভে মারা গেছে ৭ হাজার ১২৭টি শিশু। একই সময়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত অবস্থায় প্রসব হয়েছে আরও ৩ হাজার ৬১টি শিশু। চার জেলার রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসায় হাসপাতালের হিসাব জেলা পরিসংখ্যানের বাইরে রাখা হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি এমন মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জে। এরপর রয়েছে হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার। কাগজে-কলমে এগুলো কেবল সংখ্যা। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে এমন একটি পরিবার, যারা সন্তানকে কোলে নেওয়ার বদলে দাফনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের একটি শীতের রাত। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার কাড়াবাল্লা গ্রামের তান্নি আক্তারে প্রসববেদনা শুরু হয়। পরিবার তাকে নিয়ে যায় পাশের জকিগঞ্জ উপজেলার একটি বেসরকারি এনজিও পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
সেখানে চিকিৎসাকর্মীরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা চালান প্রায় ৩০ ঘণ্টা। কিন্তু প্রসব এগোচ্ছিল না। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তাকে দ্রুত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, সেখানে নিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু পরিবার দ্বিধায় পড়ে। ওসমানী হাসপাতালে গেলে সিজার করতে হবে, এমন আশঙ্কায় তারা সেখানে যেতে রাজি হননি। অপেক্ষা চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হয় এক নির্মম সংবাদে। মায়ের গর্ভেই মারা যায় শিশুটি।চিকিৎসকদের কাছে এটি একটি পরিচিত দৃশ্য। অনেক রোগী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে অপেক্ষা করেন। কেউ সিজারের ভয়ে, কেউ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায়, আবার কেউ পরিবারের সিদ্ধান্তের কারণে সময়মতো উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে পারেন না। যখন তারা হাসপাতালে পৌঁছান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের করার মতো খুব বেশি কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। তান্নির ঘটনাও সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
কিন্তু এই একটি মৃত্যু রেখে গিয়েছে বহু প্রশ্ন। তান্নির শিশুটি কি বাঁচানো সম্ভব ছিল? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে চান না চিকিৎসকেরা। কারণ প্রতিটি গর্ভধারণের জটিলতা আলাদা।তবে তারা বলছেন, গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, দীর্ঘ সময় প্রসববেদনা চলা কিংবা প্রসবের অগ্রগতি না হলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা এবং সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা হলো, এই মৌলিক চিকিৎসা বার্তাটি এখনো সিলেটের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়নি। কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, কোথাও কুসংস্কার, কোথাও চিকিৎসক সংকট, আবার কোথাও পরিবারই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে। আর সেই দেরির মূল্য অনেক সময় দিতে হয় জন্ম নেওয়ার আগেই একটি শিশুকে।
তান্নির মতো ভাগ্য হয়নি আছিয়া বেগমের। গত জানুয়ারিতে সিলেট নগরের সুবিদবাজারের বনকলাপাড়া এলাকায় গর্ভধারণের সাড়ে ছয় মাসের মাথায় হঠাৎ তীব্র ব্যথা অনুভব করেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় এক দাইয়ের মাধ্যমে বাড়িতেই প্রসব করানোর চেষ্টা শুরু করেন।সময় গড়াচ্ছিল। গর্ভের শিশুটির অবস্থাও ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে বাড়ির মালিক জোর করেই আছিয়াকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
হাসপাতালে পৌঁছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, গর্ভের অপরিণত শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয়। পরে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়।
জন্মের পরও সংকট কাটেনি। নবজাতকটিকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয় প্রায় ২০ দিন। চিকিৎসকদের ধারাবাহিক চেষ্টায় ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। পরে তাকে বাড়ি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
একই অঞ্চলের দুটি পরিবার। একটিতে হাসপাতাল যেতে দেরি হওয়ায় মায়ের গর্ভেই থেমে যায় একটি হৃদস্পন্দন। অন্যটিতে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানোয় বেঁচে যায় একটি জীবন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এই দুই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
গর্ভাবস্থার জটিলতা দেখা দেওয়ার পরও অনেক পরিবার কেন হাসপাতালে যেতে চায় না? সিলেটের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। কেউ সিজারের ভয় পান। কেউ মনে করেন, হাসপাতালে গেলে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করানো হবে। কেউ অর্থের অভাবে চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। আবার অনেক পরিবার এখনো বিশ্বাস করে, গ্রামের দাই, কবিরাজ কিংবা ঝাড়ফুঁকেই সমস্যার সমাধান হবে।
কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া এলাকার এক নারী বলেন, অনেক পরিবারে গর্ভধারণের খবর প্রকাশ করাকেও ভালো চোখে দেখা হয় না। লোকলজ্জা কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, অনেক সময় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে যায়। চিকিৎসকের পরিবর্তে ওঝা বা কবিরাজের শরণাপন্ন হওয়ার ঘটনাও এখনো ঘটছে।
হাওরের পথ পেরোতে পেরোতেই ফুরিয়ে যায় সময়সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলার চিকিৎসকেরা বলছেন, এর পেছনে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নয়, ভৌগোলিক বাস্তবতাও বড় কারণ।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘তাহিরপুর, শাল্লা, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজারের মতো উপজেলাগুলোর অনেক গ্রাম থেকে হাসপাতালে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। বছরের দীর্ঘ সময় এসব এলাকা পানিতে প্লাবিত থাকে। কোথাও নৌকা, কোথাও মোটরসাইকেল, আবার কোথাও একাধিক যানবাহন বদলে হাসপাতালে যেতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো এবং প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পরও হাসপাতালে আসতে দেরি করা অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।’
চিকিৎসকের চেয়ে দাইয়ের ওপর আস্থাসুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা কামরুল আলম নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘এলাকায় ভালো গাইনি চিকিৎসক না থাকায় সন্তান জন্মের আগেই স্ত্রীকে সিলেট শহরে নিয়ে আসি। কারণ আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি। এলাকায় থাকলে কী হতো জানি না। শেষ পর্যন্ত সিজারের মাধ্যমে সুস্থ সন্তান হয়েছে।’
তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সবার থাকে না। দারিদ্র্য, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসক সংকট এবং সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার শেষ পর্যন্ত স্থানীয় দাইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেক রোগীকে হাসপাতালে আনা হয় তখন, যখন মা ও শিশুকে বাঁচানোর সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।’যে মৃত্যুর কারণ আজও অজানাসব অনাগত শিশুমৃত্যুর ব্যাখ্যা চিকিৎসাবিজ্ঞান দিতে পারে না। সিলেটের গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশিদা আখতার বলেন, ‘মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যুর প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায় না। অনেক সময় মৃত শিশুর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়। তারপরও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে বাকি বড় অংশের মৃত্যুর ক্ষেত্রে কিছু পরিচিত ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত প্রসবপূর্ব পরীক্ষা না করা, মায়ের পুষ্টিহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা সময়মতো শনাক্ত না হওয়া, সংক্রমণ, প্রসব বিলম্বিত হওয়া এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করা।’
ডা. রাশিদা আখতার বলেন, ‘একজন গর্ভবতী মায়ের অন্তত চারবার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় অনেক নারী গর্ভাবস্থার পুরো সময়েই একবারও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান না।’তিনি আরও বলেন, ‘শিশুর নড়াচড়া কমে গেলে, রক্তপাত হলে বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার সিদ্ধান্তই একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।’
প্রতিটি মৃত শিশুর পেছনে তাই শুধু একটি চিকিৎসাগত ব্যর্থতার গল্প নেই। রয়েছে সামাজিক বিশ্বাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারার এক জটিল সমীকরণ। আর সেই সমীকরণের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় এমন একটি শিশু, যে পৃথিবীর আলোই দেখতে পারে না।
চিকিৎসক সংকট, সচেতনতার ঘাটতি আর এক কঠিন বাস্তবতা
চিকিৎসকদের মতে, মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যুর পেছনে একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। অনেক সময় চিকিৎসা, ভৌগোলিক বাস্তবতা, সামাজিক বিশ্বাস এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে একটি জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সিলেট বিভাগে স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে গাইনি বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত নার্সের ঘাটতি অনেক উপজেলা হাসপাতালে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করছে।’
তার ভাষ্য, ‘গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট বিভাগে চিকিৎসক ও নার্সের শূন্য পদের হার বেশি। স্থানীয়দের একটি বড় অংশ বিদেশমুখী হওয়ায় অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যখাতে যোগ দিতে আগ্রহী হন না। আবার অন্য জেলা থেকে যারা আসেন, তাদের অনেকেই দ্রুত বদলির চেষ্টা করেন।’
তবে তিনি বলেন, ‘জনবল সংকট থাকলেও সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় ‘মা সমাবেশ’ আয়োজন করে প্রসবপূর্ব পরীক্ষা, পুষ্টি এবং নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে সচেতন করারও চেষ্টা চলছে।’
তবু বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগের সুফল এখনো সব এলাকায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।
ছয় বছরের হিসাব কী বলছে
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ছয় বছরে চার জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৭ হাজার ১২৭।
জেলা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জে, ২ হাজার ৪৩৭টি। এরপর হবিগঞ্জে ২ হাজার ৩৭৯টি, সিলেট জেলায় ১ হাজার ৪৪৬টি এবং মৌলভীবাজারে ৮৬৫টি।
একই সময়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত অবস্থায় প্রসব হয়েছে আরও ৩ হাজার ৬১টি শিশু। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বিভাগের চার জেলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জটিল রোগীরা এখানে আসেন। সে কারণে হাসপাতালের পরিসংখ্যানকে জেলা পর্যায়ের হিসাবের সঙ্গে যোগ করা হয় না।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যগুলো একটি প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এখনো অনেক গর্ভধারণ নিরাপদ প্রসব পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।
মৃত শিশুর ক্ষেত্রে কেন সিজার করা হয় না?
মাতৃগর্ভে শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর অনেক পরিবারের প্রথম অনুরোধ থাকে দ্রুত সিজার করে সন্তান বের করে আনার। কিন্তু সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, মৃত শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিই ভিন্ন।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘গর্ভে শিশুর মৃত্যু হলে এবং মায়ের অন্য কোনো জটিলতা না থাকলে সাধারণত সিজার করা হয় না। ওষুধের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব করানোর চেষ্টা করা হয়। সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার। মৃত শিশুর ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করলে ভবিষ্যতে মায়ের গর্ভধারণ ও প্রসবের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রসবই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।’
তিনি বলেন, বঅনেক সময় স্বজনেরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে দ্রুত সিজারের জন্য চাপ দেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই চিকিৎসা চালিয়ে যান।’পরিসংখ্যানের আড়ালে যে শোকএকটি মৃত সন্তান প্রসব শুধু একটি চিকিৎসাগত ঘটনা নয়।।এটি একজন মায়ের দীর্ঘ নয় মাসের অপেক্ষার সমাপ্তি। একটি পরিবারের অসমাপ্ত স্বপ্ন। এমন এক শোক, যা অনেক সময় প্রকাশও করা যায় না।
চিকিৎসকদের মতে, মৃত সন্তান প্রসবের পর অনেক মা দীর্ঘদিন মানসিক আঘাত বহন করেন। কেউ নিজেকে দায়ী করেন, কেউ সামাজিক চাপের মুখে পড়েন, আবার কেউ পরবর্তী গর্ভধারণ নিয়েও ভয়ের মধ্যে থাকেন।
এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মৃত সন্তান প্রসবকে শুধু একটি স্বাস্থ্যসূচক নয়, বরং মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার সম্মিলিত সূচক হিসেবে বিবেচনা করে।
যে প্রশ্ন রয়ে যায়
ছয় বছরে ১০ হাজারের বেশি অনাগত শিশুর মৃত্যুর সরকারি হিসাব একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায় সিলেটকে। এই সংখ্যার একটি অংশের পেছনে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমীমাংসিত প্রশ্ন। কিন্তু আরেকটি বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা, কুসংস্কার, দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া, দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা।
প্রতিটি মৃত্যু হয়তো প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর কারণ জানা, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং যেখানে সম্ভব সেখানে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া, সেটিই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একটি নামহীন শিশু রয়েছে, যে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারিয়ে গেছে। আর রয়েছে একজন মা, যার কাছে সেই শিশুটি কোনো সংখ্যা নয়, তার পুরো পৃথিবী।





